পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বোন ডা. উজমা খানকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ইমরানের হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে করা একাধিক আবেদনের শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট এসব নির্দেশ দেন। বিচারপতি শহিদ ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে আরও ছিলেন বিচারপতি নাঈম আখতার আফগান ও বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিম।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব মৌলিক অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বন্দীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আদালত এই নির্দেশ দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বোন ডা. উজমা খানকে যুক্ত রাখতে হবে। তবে ইমরানের আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ বা শেয়ার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার স্বাস্থ্য নিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে আদালত।
এর এক দিন আগে আদিয়ালা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট ইমরানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে জমা দেন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে থাকা ইমরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। কারা চিকিৎসকেরা দিনে তিনবার তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। পাশাপাশি রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন ও রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
প্রতিবেদনের সংযুক্তিতে বলা হয়, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (পিআইএমএস) চিকিৎসক ডা. আখতার আলী বান্দেশাহ গত ১ আগস্ট ইমরানকে পরীক্ষা করেন। সে সময় তিনি অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, বুক ধড়ফড়, মাথাব্যথা ও অস্থিরতার কথা জানান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে না পারা এবং সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সুযোগ না থাকায় মানসিক চাপ বাড়ছে বলেও তিনি জানান।
চিকিৎসক মানসিক চাপ কমাতে ইমরানের স্ত্রীর সঙ্গে আরও ঘন ঘন সাক্ষাতের ব্যবস্থা এবং পড়ার উপকরণ দেওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির সুপারিশ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধের মাত্রা বাড়ানোর কথা বলা হয়। ৭৪ বছর বয়সী ইমরান বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও চিকিৎসক সতর্ক করেন।
এর আগে ১০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়, মাথায় ভারী অনুভূতি ও বুক ধড়ফড়ের অভিযোগের পর পিআইএমএসের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড ইমরানকে পরীক্ষা করেছে। বোর্ড তার দৈনন্দিন রুটিনে প্রতিদিন এক ঘণ্টা হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগ রাখার সুপারিশ করে।
মেডিকেল বোর্ড সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টেলিভিশন ও বই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য বা স্ত্রীর সঙ্গে আরও ঘন ঘন যোগাযোগের পরামর্শ দেয়। বোর্ডের মতে, নিয়মিত পারিবারিক যোগাযোগ ইমরানের উদ্বেগ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
ইমরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে পাকিস্তান সরকার এবং পিটিআইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান রয়েছে। পিটিআই ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে সরকার দাবি করে আসছে, ইমরানের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিটিআই যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখায়নি।
এর আগে গত মে মাসে ইমরান খান সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর, ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরিবারের কাছে দেওয়ার নির্দেশনা চান। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই তার স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার নিয়ে শুনানি চলছিল। মঙ্গলবারের আদেশে আদালত পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিয়মিত পারিবারিক সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।