আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল সেই অমোঘ ঘোষণা— "এক দফা: শেখ হাসিনার পদত্যাগ।" এই একটি ঘোষণাই মূলত ৫ আগস্টের মহাবিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল। আজকের এই স্থিতিশীল সময়ে দাঁড়িয়ে সেই দিনের ভয়াবহতা কল্পনা করা কঠিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দুই সমন্বয়ক, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভ্যুত্থানের পর স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, ১ দফা ঘোষণার সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল চরম অনিশ্চয়তা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
আসিফ মাহমুদ সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে পরবর্তীতে বলেছিলেন, "আমরা তখন কেউ নিরাপদ ছিলাম না। প্রত্যেকে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থেকে দফায় দফায় বৈঠক করছিলাম। কিন্তু আমরা জানতাম, আন্দোলনের যে পর্যায়ে আমরা পৌঁছেছি, সেখান থেকে ফেরার পথ নেই। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সিদ্ধান্ত নিই—আজ শহীদ মিনার থেকেই এক দফা ঘোষণা হবে।" যদিও আন্দোলনের শুরুতে সরাসরি পদত্যাগের ডাক দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না।
সমন্বয়কদের প্রাথমিক চিন্তা ছিল একটি 'সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের' রূপরেখা দেওয়া। অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিচারণে জানা যায়, আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত হয়, নাহিদ ইসলামই এই চূড়ান্ত ঘোষণাটি দেবেন। তবে এই সিদ্ধান্তের কথা তখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল জানত না। সমন্বয়করা চেয়েছিলেন আন্দোলনটি যেন সম্পূর্ণভাবে ছাত্র-জনতার নিজস্ব পরিচয়েই এগিয়ে যায়।
৩ আগস্ট দুপুরের পর থেকেই ঢাকার সব পথ যেন মিশে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কোনো বাস, ট্রাক বা গণপরিবহন ছিল না, তবু মানুষ পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে হাজির হয়েছিল সেখানে। এক পর্যায়ে পুরো এলাকাটি একটি বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেদিন মিছিলে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছিল না। নাহিদ ইসলাম পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, "সেদিন সবাই নিজ নিজ রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে কেবল সাধারণ মানুষ হিসেবে এসেছিলেন। ছাত্র-জনতার সেই ঐক্যই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।" শহীদ মিনারের সেই উত্তাল জনসমুদ্র থেকে যখন 'এক দফা' ঘোষিত হলো, তখন আন্দোলনটি আর কেবল ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না; এটি রূপ নিল একটি সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানে।
এই ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির মুখে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের। উপসংহার ৩ আগস্ট ছিল মূলত প্রতিরোধের সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা পুরো দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজ দুই বছর পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, শহীদ মিনারের সেই সাহসী সিদ্ধান্তটি না এলে ৫ আগস্টের মহাবিজয় হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হতো। ৩ আগস্ট তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত 'জন্মসনদ'।
ডেস্ক রিপোর্ট