ভারতে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলে ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা চললেও ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে নতুন জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (এইমস) চিকিৎসকেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) দ্রুত বাড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
এইমসের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা জানান, ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও এখনও এ রোগে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ভারত ভাইরাল হেপাটাইটিসের উচ্চ বোঝা বহনকারী দেশগুলোর একটি। দেশটিতে আনুমানিক ৪ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত। এ ছাড়া ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস-সি রয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি এখনও ভারতে সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার এবং হেপাটাইটিস-সম্পর্কিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান ভাইরাসঘটিত কারণ। তবে রোগের ব্যাপকতার তুলনায় শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফ্যাটি লিভারের দ্রুত বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকেরা। MASLD আগে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) নামে পরিচিত ছিল। সাম্প্রতিক ভারতীয় গবেষণার বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশটির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং কম শারীরিক পরিশ্রমের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের মধ্যেও এ রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় প্রায় ৩৫ শতাংশ শিশুর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভারে অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না বলে রোগটি নীরবে অগ্রসর হতে পারে।
গবেষণায় বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ এবং স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে লিভার ফাইব্রোসিসের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা ১৩ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে পরিচালিত বহুকেন্দ্রিক MAP গবেষণায় ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর MASLD শনাক্ত হয়। গবেষণাটি বিভিন্ন অঞ্চলে রোগের প্রকোপের পার্থক্যও তুলে ধরেছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে স্ক্রিনিং ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা।
নয়াদিল্লির এইমসের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান ডা. প্রমোদ গার্গ বলেন, লিভারের ক্ষতি এখন শুধু ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অ্যালকোহল সেবন, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও ক্রমে সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠছে।
ভারতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহল, ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং ফ্যাটি লিভার ডিজিজ সিরোসিসের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাকিউট-অন-ক্রনিক লিভার ফেইলিউরের অন্যতম সাধারণ কারণ হিসেবে অ্যালকোহলকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় মৃত্যুঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি।
প্রতিরোধের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস-বির টিকা নেওয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার, নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা করানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, আগে রক্ত গ্রহণ করেছেন বা রক্ত দিয়েছেন এমন ব্যক্তি এবং হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের মতো উচ্চঝুঁকির জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে পরীক্ষার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে সবার জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং ব্যবস্থা, প্রাপ্তবয়স্কদের হেপাটাইটিস-বি টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা এবং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট