ঢাকা , শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) , ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
শুধু আইনে সড়ক নিরাপদ হবে না, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ: ইলিয়াস কাঞ্চন টঙ্গীতে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, শিক্ষক গ্রেপ্তার দিল্লি এড়িয়ে রুবিওর ভারত সফর, বদলাচ্ছে সম্পর্কের সমীকরণ ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ, তবু বাতিল বিআরটি প্রকল্প রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের চার বড় উদ্যোগ ইউনিসেফের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় বাংলাদেশ সরকার লাওসে চীনের নতুন সামরিক ঘাঁটি, বাড়ছে আঞ্চলিক উদ্বেগ সোনা-হীরা চোরাচালান মামলায় দিলীপ আগরওয়ালার এক দিনের রিমান্ড হাইকোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও উদ্ধার মহড়া বাংলাদেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব, বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি যুবসমাজ ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নভেম্বরের মধ্যে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে মক্কায় মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজ’ করার দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড মাদক, কিশোর গ্যাং ও র‍্যাগ ডে রোধে মাউশির নির্দেশ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে চুয়েটে ৩০ ঘণ্টা পর অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার, ক্যাম্পাসে না আসার শর্তে রেলখাতের উন্নয়নে ৮০টি নতুন ইঞ্জিন আমদানির উদ্যোগ: রেলমন্ত্রী কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আরও ৩৫৩ জন আটক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুপারিশ

ঢাকাই মসলিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গৌরবগাথা

প্রাচীন বাংলার সূক্ষ্ম বস্ত্রশিল্প, বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের গল্প

নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০২:৩৭:৪০ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৪-১০-২০২৬ ০২:৩৭:৪০ অপরাহ্ন
  • ৪ মিনিট পড়ার সময়
  • ২৯ বার পঠিত
ঢাকাই মসলিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গৌরবগাথা ছবি: সংগৃহীত

বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের অন্যতম গৌরবময় নিদর্শন ঢাকাই মসলিন। অতি সূক্ষ্ম সুতা, মিহি বুনন ও কারিগরদের অসাধারণ দক্ষতার কারণে একসময় এই কাপড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশে। রাজপরিবার, অভিজাত শ্রেণি ও ইউরোপের বিত্তশালী মানুষের কাছে মসলিন ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ইতিহাস, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতেও এই বস্ত্রের উপস্থিতি বাংলার সমৃদ্ধ অতীতের পরিচয় বহন করে।


প্রাচীন বাংলার বস্ত্রশিল্পের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও পর্যটকদের বিবরণে মিহি সুতি কাপড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ গ্রন্থে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম বস্ত্রের বর্ণনা রয়েছে। এ ছাড়া হেরোডোটাস, স্ট্র্যাবো, টলেমি ও প্লিনির মতো প্রাচীন লেখকদের রচনায়ও মসলিনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ রয়েছে।


বাংলার মসলিনের ঐতিহ্য শুধু লিখিত ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়, লোকসাহিত্যেও এর স্মৃতি টিকে আছে। ‘সোনাই বিবির পালা’য় ‘গঙ্গার জল’ নামে একটি শাড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। শাড়িটির সূক্ষ্মতা বোঝাতে পানিতে মিশে যাওয়া কিংবা শুকানোর পর পিঁপড়ায় টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো কাব্যিক উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বর্ণনা মসলিনকে ঘিরে বাংলার মানুষের কল্পনা, অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির পরিচয় দেয়।


প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্য ও অভিজাত জীবনযাপনের সঙ্গে সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের সম্পর্ক ছিল। গবেষকদের বিভিন্ন বিবরণে প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও পশ্চিম এশিয়ায় বাংলার মিহি কাপড়ের পরিচিতির কথাও উঠে এসেছে। তবে এসব ঐতিহাসিক দাবির নির্দিষ্ট সময়কাল ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নির্ধারণে প্রামাণ্য উৎসের তুলনামূলক পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলার মসলিনের খ্যাতি সম্পর্কে বিদেশি পর্যটকদের বিবরণও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ে উন্নতমানের বস্ত্র উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেন। পঞ্চদশ শতকে চীনা পর্যটক মাহুয়ানও সোনারগাঁয়ের বস্ত্রশিল্প সম্পর্কে বিবরণ দেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় পর্যটক ও বণিকদের লেখায় বাংলার সূক্ষ্ম কাপড়ের গুণমান, বুননশৈলী ও কারিগরদের দক্ষতার প্রশংসা পাওয়া যায়।


অষ্টাদশ শতকে বাংলার বস্ত্রশিল্পের উৎকর্ষ ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদেরও বিস্মিত করেছিল। ইংরেজ ঐতিহাসিক রবার্ট ওরম বাংলার তাঁতিদের তৈরি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাপড়ের বুননপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁর বিবরণে স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা ও সীমিত সরঞ্জাম ব্যবহার করে উন্নতমানের বস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কথা উঠে এসেছে।


ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল, বিশেষ করে সোনারগাঁ, কাপাসিয়া এবং শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর অববাহিকা মসলিন উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। গবেষকদের বিবরণ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে এসব অঞ্চলে সূক্ষ্ম সুতি কাপড় তৈরির পাশাপাশি সাধারণ ও মাঝারি মানের বস্ত্রও উৎপাদিত হতো। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব কাপড়ের একটি অংশ বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে রপ্তানি করা হতো।


ঢাকাই মসলিনের উৎকর্ষের পেছনে বিশেষ ধরনের তুলা ও দক্ষ কারিগরদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটি কার্পাস নামের তুলা থেকে তৈরি সূক্ষ্ম সুতা উন্নতমানের মসলিন বুনতে ব্যবহৃত হতো। তুলা থেকে সুতা তৈরি, সুতা প্রস্তুত ও তাঁতে বুননের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হতো ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও বিশেষ দক্ষতা। ঐতিহাসিকভাবে নারীরা সূক্ষ্ম সুতা কাটার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। অন্যদিকে তাঁতি ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা কাপড় বোনা, পরিশোধন, মেরামত, ইস্তিরি ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতেন।


মসলিন উৎপাদন ছিল একটি সমন্বিত কারুশিল্প। তুলা সংগ্রহ থেকে শুরু করে সুতা কাটা, তাঁতে টানা ও পড়েন সাজানো, কাপড় বোনা এবং চূড়ান্তভাবে কাপড় প্রস্তুত করা—প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা দক্ষতার প্রয়োজন হতো। এই শ্রমবিভাজন বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎপাদনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। মসলিনের উৎকর্ষ তাই শুধু কাপড়ের সূক্ষ্মতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বিস্তৃত কারিগরি জ্ঞান ও পেশাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো।


ঐতিহাসিক বিবরণে মসলিনের বিভিন্ন ধরনের নামও পাওয়া যায়। মলবুস খাস, সরকার-ই-আলা, আব-ই-রওয়ান, ঝুনা, শবনম, নয়নসুখ, খাসা, তনজেব, সরবন্দ ও ডোরিয়ার মতো নাম কাপড়ের সূক্ষ্মতা, বুনন, ব্যবহার কিংবা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। এর মধ্যে জামদানি বিশেষভাবে পরিচিত, যেখানে তাঁতে বুননের সময়ই নকশা তৈরি করা হতো। রাজপরিবার ও অভিজাত শ্রেণির পোশাক থেকে শুরু করে রুমাল, পাগড়ি ও অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরিতেও বিভিন্ন ধরনের মসলিন ব্যবহৃত হতো।


সময়ের পরিবর্তন, বাণিজ্যিক ব্যবস্থার রূপান্তর এবং ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলার বস্ত্রশিল্প নানা সংকটের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিনের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং শিল্পটি হারিয়ে যেতে থাকে। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা কারিগরি দক্ষতা ও উৎপাদনব্যবস্থার ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


মসলিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাও এই শিল্পকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। লেখক ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া ‘হাওয়ায় ইন্দ্রজাল’ নামে একটি নৃত্যনাট্য রচনা করেন, যেখানে মসলিনের বিবর্তন, বাংলার তাঁতশিল্প এবং লোকঐতিহ্যের নানা দিক তুলে ধরা হয়। ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঢাকা আহসান মঞ্জিল প্রাঙ্গণে সাধনা সংগঠন নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ করে। এতে মসলিনের ইতিহাসকে নৃত্য, সংগীত ও মঞ্চশিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।


বাংলার মসলিন কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী কাপড় নয়; এটি দেশের ইতিহাস, কারুশিল্প, লোকসাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিল্পের অতীত নিয়ে গবেষণা, ঐতিহাসিক তথ্যের সংরক্ষণ এবং কারিগরি জ্ঞানের যথাযথ নথিভুক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যটি তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে মসলিনকে ঘিরে সাহিত্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলার বস্ত্রশিল্পের গৌরবময় ইতিহাসকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-১৮

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।