রোববার (৪ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। আর এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে মোট নিহতের ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশের।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু রয়েছেন। একই সময়ে পথচারী নিহত হয়েছেন ১০৬ জন, যা মোট প্রাণহানির ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় যানবাহনের চালক ও সহকারী হিসেবে কর্মরত ৫৩ জনও প্রাণ হারিয়েছেন। এ সংখ্যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬৮টি দুর্ঘটনা বা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশই ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে।
এছাড়া পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১০৯টি, যা মোট দুর্ঘটনার ২৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি বা ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ দুর্ঘটনায়। পেছন থেকে ধাক্কার ঘটনা ঘটেছে ৬১টি।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগগুলোর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশই ঢাকা বিভাগে ঘটেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৭৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ জন। খুলনায় ৭৭টি দুর্ঘটনায় ৬১ জন এবং রাজশাহীতে ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছেন।
জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন গাজীপুরে। আর বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে সিলেটে—২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন।
রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও উঠে এসেছে। সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন।
এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ শিক্ষক, তিন সাংবাদিক, দুই চিকিৎসক, চার প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা ও একজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
ব্যাংক ও বীমা খাতের ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৮ এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক দলের ২৪ নেতাকর্মী, ২৫ ব্যবসায়ী, ২১ বিক্রয় প্রতিনিধি, তিন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, চার মোটর মেকানিক, ছয় পোশাক শ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ১৪ দিনমজুরও নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন করে নিহত হয়েছেন।
সময়ভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে—২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে।
সংস্থাটি গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, অতিরিক্ত গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, দক্ষ চালক তৈরি এবং চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সময়োপযোগী নীতিমালা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।