মঙ্গলবার আল-নুহুদ শহরের কাছে আল-জারা স্বর্ণের খনিতে পরপর কয়েকটি সংযুক্ত খনিশাফট ধসে পড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এতে বহু ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খনি শ্রমিক নিহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।
বুধবার কোরদোফান অবজারভেটরি নামের একটি পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠী এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর বেশ কয়েকজন শ্রমিক মাটির নিচে আটকা থাকতে পারেন। তবে ঘটনাস্থলে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল পৌঁছায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা সাধারণ ও সীমিত সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধসে পড়া বালুময় মাটি সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।
রাতভর উদ্ধারকাজ চালানোর চেষ্টা
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া খনিশ্রমিক খাইর আল-সাইয়েদ জাবারা বুধবার এএফপিকে বলেন, তিনি ও তার সহকর্মীরা রাতভর নিজেদের হাতে থাকা সরঞ্জাম ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়া উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, আর কতজন এখনও খনির ভেতরে আটকা পড়ে আছেন, তা তারা জানেন না।
আরেক শ্রমিক আমিন সুলেইমান জানান, খনির শাফটগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি ছিল। একটি শাফট ধসে পড়ার সময় পাশের শাফটগুলোও ধসে যায়। এতে একসঙ্গে বড় অংশের খনি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং বহু শ্রমিক আটকা পড়েন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর খনিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, খনিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবই এত বেশি প্রাণহানির অন্যতম কারণ হতে পারে।
খার্তুমভিত্তিক চিকিৎসা সংগঠন সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির অভিযোগ, খনিতে শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক ব্যবস্থা ছিল না। তাদের ভাষ্য, নিরাপত্তার ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে শ্রমিকদের জীবন গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক আরও বলেছে, উদ্ধারকাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় খনি দুর্ঘটনা
পশ্চিম কর্দোফান বর্তমানে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরএসএফের ভয়াবহ সংঘাত চলছে।
যুদ্ধের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম কর্দোফানসহ বিভিন্ন এলাকায় অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ উত্তোলনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্কের দাবি, আরএসএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা মানদণ্ড, শ্রমিক সুরক্ষা এবং উদ্ধার সরঞ্জাম ছাড়া খনন কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় বেসামরিক মানুষের জীবন সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে।
সংগঠনটি খনির ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যারা ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের অনিয়ন্ত্রিত ও নিরাপত্তাহীন খনন কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বর্ণের ওপর নির্ভরশীল সুদানের যুদ্ধ অর্থনীতি
সুদান আফ্রিকার অন্যতম প্রধান স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির স্বর্ণের বড় একটি অংশই আসে অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ খনি থেকে। অনেক ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত, অনিবন্ধিত কিংবা যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া পরিচালিত স্থানে শ্রমিকরা স্বর্ণ উত্তোলন করেন।
চলমান যুদ্ধের মধ্যে স্বর্ণ সুদানের অর্থনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ বা চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
ফলে নিরাপত্তাহীন পরিবেশে স্বর্ণ উত্তোলনের প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এতে শ্রমিকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি উদ্ধারকাজেও তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা।
আল-জারা খনিতে সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি সেই ঝুঁকিকেই আবার সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল ও ভারী যন্ত্রপাতির অনুপস্থিতিতে স্থানীয় মানুষই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা