বিশ্ব বাণিজ্যের বড় একটি অংশ সমুদ্রপথনির্ভর। আন্তর্জাতিকভাবে পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরতা থাকলেও সেই বাণিজ্য সচল রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান জাহাজের জ্বালানি এখন সরবরাহ সংকটে পড়েছে। জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে বহুল ব্যবহৃত হেভি ফুয়েল অয়েল বা বানকার ফুয়েলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে এর দামও বাড়ছে। এর ফলে শুধু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নয়, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফুয়েল অয়েল রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে অঞ্চলটি থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ব্যারেল ফুয়েল অয়েল রপ্তানি হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের এই ঘাটতির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
একই সময়ে তেল পরিশোধনাগারগুলোর উৎপাদন কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক হওয়ায় অনেক রিফাইনারি জাহাজের জ্বালানি ফুয়েল অয়েলের পরিবর্তে ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে বাজারে একদিকে বানকার ফুয়েলের সরবরাহ কমছে, অন্যদিকে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এর চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই ব্যবধানই জাহাজের জ্বালানির বাজারে সংকট আরও তীব্র করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান যুদ্ধেরও বড় প্রভাব রয়েছে। সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বিপর্যস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুথিদের হামলার কারণে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের জাহাজ চলাচল সংকট। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে বিকল্প ও দীর্ঘতর পথে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে জাহাজের যাত্রাপথ ও সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ এবং পরিবহন ব্যয়।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি থেকেও ফুয়েল অয়েল রপ্তানি কমেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি রাশিয়ার সরবরাহ কমে যাওয়াও বৈশ্বিক বাজারে জাহাজের জ্বালানি সংকটকে আরও গভীর করছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বানকার ফুয়েল হাব সিঙ্গাপুরও এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ পড়েনি। দেশটি বছরে ব্যবহৃত প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল ফুয়েল অয়েলের অর্ধেকের বেশি আমদানি করে। যুদ্ধ শুরুর পর সিঙ্গাপুরে ভিএলএসএফও বা কম সালফারযুক্ত জাহাজের জ্বালানির দাম প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জ্বালানির দাম প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ৮২৫ ডলারে পৌঁছেছে।
জাহাজের জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু শিপিং কোম্পানির পরিচালন ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্য উৎপাদক, আমদানিকারক ও ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকা দেশগুলোর বাজারেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে জাহাজের জ্বালানির দামও সহজে কমবে না। কারণ, বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত তেল পরিশোধন সক্ষমতা সীমিত। ফলে সরবরাহ ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা কঠিন হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জাহাজের জ্বালানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের বাজারদরেও এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জাহাজের জ্বালানি সংকট
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফুয়েল অয়েল রপ্তানি কমেছে ৪৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে জাহাজের জ্বালানির দাম বেড়েছে ৭৬ শতাংশ।
নিউজটি শুনুন
- আপলোড সময় : ০৮-০৯-২০২৬ ১০:১৯:৪৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৯-২০২৬ ১০:১৯:৪৩ পূর্বাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ১১ বার পঠিত
ছবি সংগৃহীত
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
সর্বশেষ সংবাদ
এ জাতীয় আরো খবর