দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৩ দিন ধরে চুক্তি অনুযায়ী সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে ভারতের আদানি গ্রুপ। আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ জানতে এবং চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ বিদ্যুৎ দিতে চলতি মাসে তিন দফা চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে প্রতিবার সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গত আড়াই বছরে কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সর্বশেষ রোববার সরবরাহ নেমে আসে ৯১৫ মেগাওয়াটে। ৭ আগস্ট ভোর ৫টায়ও আদানি বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল। পরদিন ৮ আগস্ট তা কমে ৭৯০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, আগস্টে আদানিকে পাঠানো তিনটি চিঠির জবাবে কয়লা ভিজে যাওয়া এবং কয়লা পরিবহণের রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবারই তিন দিনের মধ্যে পূর্ণ সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঝেমধ্যে এক বা দুই দিন ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের পর আবার তা কমে যাচ্ছে।
আদানির পক্ষের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে ইমেইল করা হলেও রোববার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। পিডিবি জানিয়েছে, কয়লার দাম নিয়ে আদানির সঙ্গে বিরোধ রয়েছে এবং বিষয়টি অর্থনৈতিক আদালতের একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে বিচারাধীন। তবে বাংলাদেশের কাছে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই। গত মাসেও প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি ডলারের বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমার পাশাপাশি আবাসিক, সিএনজি স্টেশন ও শিল্পকারখানায়ও দুর্ভোগ বেড়েছে। ডায়িং ও নিটিং কারখানাগুলো দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। রোববার দুপুর ১২টার পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আদানি ছাড়া দেশের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের কথা থাকলেও রোববার দুপুর ২টায় উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন নেমে এসেছে ৫৬৫ মেগাওয়াটে। রামপালে প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট, আরএনপিএলে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং এসএস পাওয়ারে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ থাকায় সেখান থেকেও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
আদানি চুক্তির সঙ্গে বর্তমান সরবরাহ সংকটের কোনো ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তারা দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি উল্লেখ করলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানোর সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত নয়। ভারতে গিয়ে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কয়লা সরবরাহ পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তিতে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটির কারণে ২৫ বছর বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক দায় বহন করতে হতে পারে এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি তেল কেনার জন্য রোববার অর্থ মন্ত্রণালয় ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।