ঢাকা , বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬ , ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৫ সফর ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বিমান ও হেলিকপ্টারের এভিয়েশন জেট ফুয়েলে ভেজাল: উড্ডয়নে ঝুঁকি চীন ও পাকিস্তানের নৌশক্তি বৃদ্ধিতে ভারতের মাথায় বাজ সম্পদ বিবরণী দাখিল না করায় সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস সুরের ৩ বছর কারাদণ্ড ট্যাল্ক পণ্য নিয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার দিতে রাজি জনসন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে আজ ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সিইসির বৈঠক শর্ত সাপেক্ষে মগবাজার আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স ফেরত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে রিট যুদ্ধ বা শান্তির সময় নির্ধারণের অধিকার ইউএসকে দেওয়া হবে না:ইরান ‘ঝুঁকিপূর্ণ রুটে’ হরমুজ পার হচ্ছিল ছয়টি জাহাজ, দাবি ইরানের দীর্ঘ বিরতির পর আজ শুরু হচ্ছে চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি: ইএসডিওর গবেষণায় উদ্বেগজনক দায়িত্ব নিয়েই যে অঙ্গীকার করলেন ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী এবার হোদেইদায় হামলা সৌদির, পাল্টা হুমকি হুথিদের নভোথিয়েটারে সামিটে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ভারতীয় নাগরিক নিহত পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যেসব সুবিধা পাবেন

বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রথম বিস্তৃত গবেষণায় দেশের প্যাকেটজাত ও কাঁচা দুধে মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে তীব্র উদ্বেগ।
নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ২৯-০৭-২০২৬ ০১:২৬:৩৯ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৯-০৭-২০২৬ ০১:২৬:৩৯ অপরাহ্ন
  • ৪ মিনিট পড়ার সময়
  • ৪২ বার পঠিত
বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচা দুধ, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল ও গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধে।
 
এ গবেষণা পরিচালনা করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একদল গবেষক। তাদের মতে, দুধ গ্রহণের পরিমাণ ও শরীরের ওজনের অনুপাতে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শরীরে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
 
গবেষণাটির শিরোনাম ‘বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ: বৈশিষ্ট্য নিরূপণ, খাদ্যজনিত সংস্পর্শ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন’। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে এর প্রবেশ এবং বিভিন্ন প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে এটিই দেশের প্রথম বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
 
গবেষণার নেতৃত্ব দেন সানাউল্লাহ মাজুমদার। গবেষক দলে ছিলেন রেহেনুমা তারান্নুম, মো. মোশিউজ্জামান আদনান, তানজুম কবির খুকু, মো. রাসেল আলী, শাহুদা ইসলাম সোয়া, মো. আবদুর রাকিব, আলম তাজ আরা অর্থী, মো. মামুন ইসলাম এবং মো. ওমর ফারুক। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গবেষণা অনুদানের অর্থায়নে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।
 
গবেষণার জন্য মোট ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৭টি ছিল কাঁচা দুধ, ১২টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তরল ও গুঁড়া দুধ এবং ১২টি ছিল অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য। কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা হয় ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। অন্যদিকে প্যাকেটজাত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সংগ্রহ করা হয় বাজার ও সুপারশপ থেকে।
 
নমুনাগুলো পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক পৃথক করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং অবলোহিত রশ্মিভিত্তিক রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন ও ধরন শনাক্ত করা হয়।
 
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডের দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। একই পরিমাণ কাঁচা দুধে পাওয়া গেছে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০ দশমিক ৮০টি কণা।
 
গবেষকদের ধারণা, দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে কারখানায় পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং প্যাকেটজাত করার প্রতিটি ধাপেই প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার কারণে ব্র্যান্ডের দুধে কণার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেট ছাড়াও উৎপাদন লাইনের পাইপ, ফিল্টার, যন্ত্রপাতি, গ্লাভস, কর্মীদের কৃত্রিম তন্তুর পোশাক এবং কারখানার বাতাস থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক দুধে মিশতে পারে। তবে কোন উৎস থেকে কত শতাংশ কণা এসেছে, তা এই গবেষণায় নির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা হয়নি।
 
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে পাওয়া অধিকাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল স্বচ্ছ রঙের, আঁশের মতো আকৃতির এবং ২৫০ মাইক্রোমিটারের কম আকারের। কাঁচা দুধে পাওয়া কণার প্রায় ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং ব্র্যান্ডের দুধে ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশই ছিল আঁশ আকৃতির। গবেষকদের মতে, এসব কণা মূলত কৃত্রিম তন্তুর কাপড়, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, পাইপলাইন, গ্লাভস ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশ থেকে আসতে পারে।
 
গবেষণায় টেফলনজাত, পিইটি, নাইলন-৬, পলিইথিলিন, পিডিএমএস, পিপিএস, পিভিসি, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত হয়েছে। কাঁচা দুধে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে টেফলনজাত উপাদান ও পিইটি। অন্যদিকে ব্র্যান্ডের দুধে টেফলনজাত উপাদানের পাশাপাশি পিডিএমএস ও পিইটির উপস্থিতি বেশি ছিল। দুগ্ধজাত পণ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে পিইটি, নাইলন-৬ এবং পিপিএস।
 
গবেষণায় বয়স, শরীরের ওজন এবং দৈনিক দুধ গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনা করে খাদ্যের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্ভাব্য হার নির্ণয় করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শরীরের ওজন কম এবং দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় শিশুদের ক্ষেত্রে এই গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী যেসব শিশু নিয়মিত ব্র্যান্ডের দুধ পান করে, তাদের সম্ভাব্য মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
 
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা মূল্যায়নে গবেষকেরা দূষণ সূচক, দূষণের চাপের সূচক এবং প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদানভিত্তিক ঝুঁকি সূচক ব্যবহার করেছেন। ফলাফলে কাঁচা দুধকে উচ্চ ঝুঁকি, ব্র্যান্ডের দুধকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যকে মাঝারি ঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
 
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কাঁচা দুধে মোট কণার সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও সেখানে শনাক্ত হওয়া কিছু প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদানের বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা বেশি দেখা গেছে। তবে এই সূচকগুলো সরাসরি কোনো রোগ হওয়ার প্রমাণ নয়; বরং দূষণের মাত্রা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও, খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে এর বিস্তার বিশ্বজুড়েই উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
 
সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, গর্ভফুল এবং অন্যান্য দেহকলাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
 
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একটি উদীয়মান খাদ্যনিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। তারা দুধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নতমানের পরিশোধন ব্যবস্থা চালু, কম প্লাস্টিক নির্গমনকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, উৎপাদন পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছেন।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।