দেইর আল-বালাহর একটি দোকানে প্রিপেইড ইন্টারনেট কার্ড বিক্রি করেন মোহসেন। যুদ্ধ শুরুর আগে নার্সিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে পেশাগত লাইসেন্স নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল হাসপাতালে কাজ করা, স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করা কিংবা বিশেষায়িত কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়া। কিন্তু যুদ্ধ তার সেই পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাস দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন মোহসেন। সেখানে আহত ও নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল বিপুল। পরে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তাকে অন্য কাজ খুঁজতে হয়।
মোহসেন জানান, কাজ করে কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই অন্তত সামান্য আয় হবে—এমন অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করেন। এখন তার প্রথম চাওয়া একটি স্থায়ী ও ভালো বেতনের চাকরি, যাতে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে পারেন। এরপরই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা।
আগামী ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের আইনসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ২০০৬ সালের পর এটিই হবে প্রথম ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচন। এই নির্বাচন মোহসেনের জন্যও প্রথম জাতীয় ভোট। তিনি চান, প্রার্থীরা তার প্রজন্মের বেকারত্ব, নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা নিয়ে কথা বলুন।
গাজায় বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। দীর্ঘদিনের অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে ভূখণ্ডটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ ও ধ্বংসের কারণে বহু মানুষ জীবিকা ও বসতভিটা হারিয়েছেন।
মোহসেনের পরিবারের গাজার সালাহ আল-দিন সড়কের পূর্বদিকে জমি রয়েছে। ওই এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় তিনি সেখানে যেতে পারেন না। তিনি আশা করেন, যুদ্ধবিরতি অনুযায়ী ইসরাইলি বাহিনী ওই এলাকা থেকে সরে যাবে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় পুনর্গঠন শুরু হবে।
তার কাছে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, একজন প্রার্থীকে মানুষের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে তাদের কণ্ঠে কথা বলতে হবে এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও ধ্বংসে ক্ষতিগ্রস্ত তরুণদের জন্য পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে হবে।
২০০৬ সালের নির্বাচনের স্মৃতি এখনো ৫৩ বছর বয়সী গাসসান মারওয়ানের মনে রয়েছে। ওই নির্বাচনে তিনি ভোট দিয়েছিলেন। তখন হামাস জয়ী হয়েছিল। মারওয়ান আগে স্বর্ণকারের কাজ করতেন। পরে একটি কারখানা গড়ে তোলেন, যা ছিল তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
২০০৬ সালের নির্বাচনের সময় তার আশা ছিল, ভোটের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। সন্তানদের জন্য একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎও চেয়েছিলেন তিনি। নুসেইরাতের একটি স্কুলে ভোট দেওয়া সেই নির্বাচনকে তার কাছে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু মনে হয়েছিল।
কিন্তু দুই দশক পর তার নিজের জীবনও পুরোপুরি বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুদ্ধের সময় তার বাড়ি ও কারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। তিন দশকের বেশি সময়ের পরিশ্রমে গড়ে তোলা জীবিকা হারিয়ে এখন তিনি পুনর্গঠন, শান্তি ও নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মনে করেন।
সন্তানদের তাঁবুতে বসবাস করতে দেখে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান মারওয়ান। যে স্থিতিশীল বাড়ি তাদের জন্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি এখন নেই। এমনকি দীর্ঘ কর্মজীবনের পর দূর থেকে পানি বহন করার মতো কাজও করতে হচ্ছে তাকে।
মারওয়ানের মতে, যুদ্ধ মানুষের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। হতাশা ও ক্ষোভ জমতে জমতে মানুষ এখন রাজনীতির চেয়ে প্রতিদিন কীভাবে টিকে থাকবে এবং খাবার জোগাড় করবে, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবু নির্বাচন সামনে আসায় তার মধ্যে আশা ও সংশয় দুটোই রয়েছে। চারপাশের ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা কখনো কখনো তার কাছে অবাস্তব বলেও মনে হয়।
অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কমিশনের হিসাবে, গাজায় প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ ভোট দেওয়ার যোগ্য। তবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজায় নির্বাচন আয়োজন বড় ধরনের লজিস্টিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ইয়াদ আল-কুরার মতে, যুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি শেষ করে দেয়নি; বরং রাজনীতির কাছে তাদের প্রত্যাশা বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংস ও জীবিকা হারানোর পর মানুষ এখন এমন নেতৃত্ব চায়, যারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নয়, গাজার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে।
তার মতে, গাজার পুনর্গঠন, অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সচল করা এবং মানুষকে আবার জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নেওয়াই হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা