সফলতা হলো পরিশ্রমীদের প্রাপ্য, যা আল্লাহ কর্মঠ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি দৃঢ় ঈমান, মহান লক্ষ্য এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে চেষ্টা করে, সে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার বেশি উপযুক্ত। তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই আছে মহাপুরস্কার। সফল মানুষের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সাধারণত অধিক ঈমানদার, সুশৃঙ্খল, নমনীয় ও অনেক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থাকেন।
নিচে সফলতার পথে প্রধান ১০টি বাধা তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে দুর্বলতা : কখনো মানুষ নিজের দক্ষতা, জ্ঞান বা সামর্থ্যের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে অহংকারে আক্রান্ত হয়। এর ফলে হয় সে ভণ্ড সফলতার ফাঁদে পড়ে, নয়তো আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যর্থ হয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন পাখিদের দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
২. দৈনিক পরিকল্পনার অভাব : সফল মানুষের লক্ষ্য স্পষ্ট থাকে—স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয়ই।
তারা প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং অগ্রাধিকার ঠিক করেন। পাশাপাশি প্রতিটি কাজ সুন্দরভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ ভালোবাসেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, তখন তা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৮০)
৩. নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে মেলামেশা : নৈরাশ্যবাদী ও নেতিবাচক মানুষের প্রভাব ধীরে ধীরে নিজের মনেও পড়ে। তাই সফল মানুষ এমন সঙ্গ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন এবং ইতিবাচক, সৎ ও আশাবাদী মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও চরিত্রের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
৪. ব্যর্থতার কারণে হতাশ হয়ে পড়া : সফল মানুষ জানেন, ব্যর্থতা সফলতারই একটি অংশ। তারা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেন এবং নতুন উদ্যমে এগিয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘‘যদি কোনো বিপদ আসে, তবে বোলো না—‘যদি আমি এমন করতাম...’ বরং বলো, ‘এটি আল্লাহর তাকদির, তিনি যা চান তাই করেন।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
৫. অন্যের মূল্যায়ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা : সফল মানুষ নিজের মূল্য অন্যের প্রশংসা বা সমালোচনার ওপর নির্ভর করান না। তাদের নিজস্ব আদর্শ, লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস থাকে। তাই তারা অযথা মানুষের কথায় ভেঙে পড়েন না।
৬. অতিরিক্ত অজুহাত দেওয়া : সফল মানুষ ব্যর্থতা স্বীকার করতে পারেন, কিন্তু অজুহাত দেখিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যান না। তারা নিজের কাজের দায়িত্ব নিজেরাই নেন এবং সমস্যার সমাধান খোঁজেন।
৭. অন্যের সফলতায় হিংসা করা : সফল মানুষ প্রতিযোগিতা করেন, কিন্তু হিংসা করেন না। অন্যের সফলতাকে তারা অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আরো কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করেন। হিংসুক ব্যক্তি অন্যকে ক্ষতি করার আগে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেননা শুরুতেই সে হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। হিংসা দূর না হওয়া পর্যন্ত এটাই তার জন্য স্থায়ী দুনিয়াবি শাস্তি। তার চেহারা সব সময় মলিন থাকে। তার সঙ্গে তার পরিবারে হাসি ও আনন্দ থাকে না। অন্যের ক্ষতি করার চক্রান্তে ও ষড়যন্ত্রে সে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে সে সর্বদা ত্রস্ত ও ভীত থাকে। ফলে সৎ সংসর্গ থেকে সে বঞ্চিত হয়। ঘুণ পোকা যেমন কাঁচা বাঁশকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়, হিংসুক ব্যক্তির অন্তর তেমনি হিংসার আগুন কুরে কুরে খায়। এক সময় সে ধ্বংস হয়ে যায়, যেমন ঘুণে ধরা বাঁশ হঠাৎ ভেঙে পড়ে যায়। এভাবে দুনিয়ায় সে এসি ঘরে শুয়ে থেকেও হিংসার আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ কোরো না, হিংসা কোরো না, ষড়যন্ত্র কোরো না ও সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না। তোমরা পরস্পরে আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৭৬)
৮. স্বাস্থ্য ও বিশ্রামকে অবহেলা করা : শরীর ও মনের সুস্থতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সফলতা সম্ভব নয়। তাই সফল মানুষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম, স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তির যত্ন নেন। সুস্বাস্থ্যের জন্য শরীরচর্চার বিকল্প নেই। যারা কর্মব্যস্ততায় শরীরচর্চার সুযোগ পান না, চিকিৎসকরা তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে দ্রুত হাঁটার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। শরীরচর্চার অংশ হিসেবে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবাদের সঙ্গে কুস্তি লড়েছেন। মাঝেমধ্যে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন। প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গেও এক রাতে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সব সময় স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে দ্রুতগতিতে হাঁটতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, ‘আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চেয়ে দ্রুতগতিতে কাউকে হাঁটতে দেখিনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৮)
৯. অস্পষ্ট লক্ষ্য ও দুর্বল সিদ্ধান্ত : সফল মানুষের লক্ষ্য পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট থাকে। তারা জানেন তারা কী অর্জন করতে চান। ফলে তারা সহজেই নিজেদের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে পারেন। তাদের সিদ্ধান্ত দৃঢ় হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে দেরি করেন না। এভাবেই তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
১০. বাধা এলে ভয় পেয়ে থেমে যাওয়া :
জীবনের পথে বাধা আসবেই; কিন্তু সফল মানুষ প্রয়োজনে পরিকল্পনা ও কৌশল পরিবর্তন করতে দ্বিধা করেন না। তাদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকে, তবে লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন করতে তারা প্রস্তুত থাকেন। পৃথিবীতে যত মানুষ স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সফলতা অর্জনের জন্য নিরলসভাবে চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে গেছেন। এক সময় মহান আল্লাহ তাদের চেষ্টার সফল উপহার দিয়েছেন। মানুষ কোনো বিষয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে সাধনা করলে মহান আল্লাহ তাদের তা দিয়ে দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ তা-ই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন নাজম, আয়াত : ৩৯)
আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন। আমিন।
ডেস্ক রিপোর্ট