ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা দলীয় রাজনীতির গণ্ডি অতিক্রম করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন। ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার তাদের মধ্যে ব্যক্তিত্বদের অন্যতম।
একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে অধিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস নয়, বরং আইন, গণতন্ত্র, সংসদীয় সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন এবং সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাঁর আইনজ্ঞসুলভ বিশ্লেষণী ক্ষমতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার ভিত্তি রচনা করে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায়। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং পরবর্তীকালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিক্ষা এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিনিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন। তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদে পরিণত করে।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় অবদান জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সংসদ পরিচালনায় তিনি বিধি-বিধান, সংসদীয় রীতি এবং সাংবিধানিক দায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। স্পিকারের আসনে বসে তিনি কেবল অধিবেশন পরিচালনাই করেননি, বরং সংসদকে একটি কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সচেষ্ট ছিলেন। সংসদীয় বিতর্কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বিরোধী ও সরকারি দলের বক্তব্যের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সংসদের মর্যাদা রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হতে দেননি। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সেই সময়ে তাঁর দায়িত্বশীল ভূমিকা বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল আইনের শাসনের প্রতি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি সংবিধানের মর্যাদা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সর্বদা গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে তিনি সংযত ও পরিমিত অবস্থান গ্রহণ করতেন।
তাঁর সংসদীয় নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি ছিল অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি। সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় অবস্থানের পরিবর্তে সংসদীয় বিধি ও সাংবিধানিক নিয়মকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে স্পিকার হিসেবে তাঁর মেয়াদকাল বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বহু অধিবেশন দেশের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন সম্মানিত আইনজ্ঞ। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর দীর্ঘ আইনচর্চা তাঁকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আইন পেশায় তাঁর সততা, পেশাদারিত্ব এবং যুক্তিনির্ভর অবস্থানের জন্য তিনি সহকর্মী আইনজীবী ও বিচারাঙ্গনে ব্যাপক শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তাঁর আইনগত বিশ্লেষণ প্রায়ই জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের ইতিহাসে তাঁর অবদান মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায়, তিনি এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অব্যাহত রাখা এবং সংসদীয় প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সংযত আচরণ এবং সাংবিধানিক সীমারেখা মেনে চলার প্রবণতা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকেও তিনি ব্যক্তিগত সৌজন্য, ভদ্রতা এবং পরিমিতিবোধের জন্য সম্মান অর্জন করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিগত সততা ও নম্র আচরণের বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে তাঁকে একজন সজ্জন, প্রজ্ঞাবান আইনজ্ঞ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের রক্ষক হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইন অঙ্গনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁকে স্মরণ করে বলেন, তিনি ছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবক। এই মূল্যায়ন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের গুরুত্ব এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অবদানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বহন করে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল নির্বাচনী রাজনীতিতে নয়, বরং শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ সংসদীয় নেতৃত্ব এবং আইনের শাসনের ওপর নির্ভরশীল। সংসদ থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত তাঁর যাত্রা ছিল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পের চেয়েও বড় কিছু। এটি ছিল একজন আইনজ্ঞের রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার ইতিহাস, একজন সংসদ নেতার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এবং একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম তাই কেবল একজন স্পিকার বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক শাসন, সংসদীয় সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারক ও বাহক হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২
সংসদ থেকে বঙ্গভবন: ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব
সংসদ থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা
নিউজটি শুনুন
- আপলোড সময় : ২২-০৭-২০২৬ ০৩:৪৫:৫০ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৭-২০২৬ ০৩:৪৫:৫০ অপরাহ্ন
- ৫ মিনিট পড়ার সময়
- ১২ বার পঠিত
ছবি: সংগৃহীত
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
সর্বশেষ সংবাদ
এ জাতীয় আরো খবর
ডেস্ক রিপোর্ট