বিজ্ঞানে অনন্য অবদান: ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অর্জন করলেন তরুণ সংগঠক
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি ক্যাটাগরিতে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করলেন ২১ বছর বয়সী উদীয়মান সংগঠক সিয়াম
- আপলোড সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০১:৩০:৩৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৫-১০-২০২৬ ০১:৩২:৪৩ অপরাহ্ন
- ৪ মিনিট পড়ার সময়
- ২৬ বার পঠিত
ছবি: প্রতিনিধি
সামাজিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী অবদান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে অসামান্য স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়্যুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অর্জন করেছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক মো. আবদুল্লাহ আল সিয়াম। তিনি পটুয়াখালী জেলার কালিকাপুর নিবাসী মো. আবদুল হাই ও মোসা. সালমা আক্তার দম্পতির কৃতি সন্তান।
গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক বর্ণিল অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি ক্যাটাগরিতে এই সম্মাননা ক্রেস্ট, এক লক্ষ টাকার চেক ও সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন তিনি। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১৫জনকে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, মাত্র ২১ বছর বয়সেই এই সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে তিনি পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন।
বর্তমানে তিনি আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত আছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গঠনে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করে চলেছেন।
সিয়ামের এই পথচলা শুরু হয়েছিল তাঁর কৈশোর থেকেই। বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় ও সৃজনশীল করে তোলার জেদ থেকেই তিনি খুব কম বয়সে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ সায়েন্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সিনিয়র উপদেষ্টা, একই প্রতিষ্ঠানের নিউট্রিশন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ইন্টেলিজেন্ট মাইন্ডসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২৩ সালে সিয়াম ৮ম ও ৯ম ডিসিএসসি
ন্যাশনাল সায়েন্স এক্সপোজিশন আয়োজনে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের উদ্ভাবনী প্রজেক্ট ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। একই বছর তিনি ঢাকা কলেজ বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নিজের গতিশীল নেতৃত্বে দেশের অন্যতম সেরা এই প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাবটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেন।
বিজ্ঞানচর্চা কেবল শহরকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়, এই ভাবনা থেকেই সিয়াম তার কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন রাজধানীর বাইরেও। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে তিনি কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় ও প্রান্তিক অঞ্চলে গিয়ে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেন। পাশাপাশি, বাংলাদেশ অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স রিসার্চ সেন্টারের সাথে কাজ করে তিনি সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে রোবোটিক্স শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন। ইন্টেলিজেন্ট মাইন্ডসের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি অনলাইনে আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা, ইভেন্ট টক্স এবং ‘মিনিটস অব পজিটিভিটি’-এর মতো পডকাস্ট সেশন পরিচালনা করেন; যা প্রমাণ করে যে মেধা সব জায়গায় আছে, শুধু দরকার একটি সুযোগ।
শুধু তাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে ট্রাফিক সমস্যা নিরসন, বায়ুদূষণ কমানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জনকল্যাণমূলক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানেও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজেক্ট পরিচালনা করেছেন এই তরুণ। এমনকি বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালেও অনলাইন ওয়েবিনার ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। তাঁর এই ব্যবহারিক উদ্ভাবন তাঁকে এনে দিয়েছে দারুণ সব সাফল্য। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে টানা তিনবার (৪১তম, ৪২তম ও ৪৩তম) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তিনি বড় বড় সায়েন্স কার্নিভালেও একাধিক ট্রফি অর্জন করেছেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে সিয়াম সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকা কলেজে বিভিন্ন কর্মশালা ও ইন্টারেক্টিভ সেশনের আয়োজন করেন, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে পারে। কোকারিকুলার কার্যক্রমকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনায় যুক্ত করাটাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। গতানুগতিক বইয়ের বাইরে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও সাধারণ জ্ঞান শেখানোর জন্য তিনি কুইজ লীগ বা বিশেষ সেশনের মতো আনন্দদায়ক ও ইন্টারেক্টিভ লার্নিং প্রসেস গড়ে তোলেন।
২০২০ সালে যখন মহামারী করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেল, সিয়াম তখন এই সৃজনশীল চর্চাকে থমকে যেতে দেননি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তিনি দেশব্যাপী অনলাইন ওয়েবিনার, সায়েন্স কুইজ ও সৃজনশীল কর্মশালার আয়োজন করেন। মানসিক চাপ ও বিচ্ছিন্নতার সেই সময়েও তিনি হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল শিক্ষার সাথে যুক্ত রাখেন।
এখন পর্যন্ত সিয়ামের কাজ সরাসরি উপকৃত করেছে বাংলাদেশের ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কেবল সংখ্যা নয়, বরং মেন্টরশিপের জাদুকরী প্রভাব। তাঁর ক্লাব ও ট্রেনিং সেশনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, রোবোটিক্স ও কুইজে ২০০টির বেশি পুরস্কার জিতেছে। এমনকি তিনি যে ইভেন্ট মডেল ও কর্মশালা মডিউলগুলো তৈরি করে গেছেন, তা আজ তাঁর অনুজরাও চালিয়ে যাচ্ছেন, যা তাঁর কাজের একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি তৈরি করেছে।
ছেলের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত বাবা মো. আবদুল হাই আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “এমন অর্জন বাবা হিসেবে আমার জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। ওর প্রচেষ্টা ও উদ্যমের এত সুন্দর ফলাফল সত্যিই আনন্দের।”
পুরস্কার প্রাপ্তির পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মো. আবদুল্লাহ আল সিয়াম বলেন—
“প্রায় অর্ধযুগের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ পাওয়া এই স্বীকৃতি ও সম্মাননা আমাকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম পরিচালনা করে যেতে প্রেরণা জোগাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ও দিকনির্দেশনা আমাকে আমৃত্যু নিজেকে বাংলাদেশের জন্য বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।”
তরুণ বয়সে সিয়ামের এই জাতীয় অর্জন দেশের নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সমাজসেবামূলক কাজে আরও বেশি এগিয়ে আসতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
মা শা আল্লাহ্