Khairul Islam
নজরে সানী : Affan Bin Sharfuddin Hafi.
ভূমিকা
সমকালীন বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বত্ব (Intellectual Property Right) ও কপিরাইট আইন একটি বহুল আলোচিত বিষয়। প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার আধুনিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এক ভাষার রচিত গ্রন্থ অন্য ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল লেখকের অনুমতি নেওয়া বাধ্যবাধকতামূলক কি না এ নিয়ে আধুনিক ইসলামি আইনবিদ (ফুকাহা)-দের মাঝে দুটি বিপরিতমুখী মতামত পরিলক্ষিত হয়।
একদিকে অনুবাদকে মূল রচনারই একটি শাখা বা সম্প্রসারণ ধরে নিয়ে লেখকের অনুমতি ব্যতিরেকে অনুবাদকে শরিয়তবিরোধী মনে করা হয়।
অন্যদিকে, অনুবাদকে একটি স্বতন্ত্র ও সৃজনশীল বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ম হিসেবে বিবেচনা করে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অনুমতি ছাড়াই অনুবাদের বৈধতা দেওয়া হয়। একাডেমিক ও ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই মতের বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো।
সমকালীন আলেমদের মতপার্থক্য ও বিশ্লেষণ
প্রথম মত: অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক
একদল সমকালীন ফকীহ্ ও ফিকহ একাডেমি লেখকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আর্থিক অধিকারকে শরীয়তস্বীকৃত ‘মাল’ (সম্পদ) বা স্বীকৃত অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন।
তাঁদের মতে—
• স্বত্বাধিকার সংরক্ষণ: গ্রন্থ প্রকাশ ও অনুবাদের অধিকার মূল লেখকের সংরক্ষিত স্বত্বের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, তাঁর অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ এ অধিকার ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না।
• অনুমতির শর্ত: লেখকের অনুমতি ছাড়া তাঁর গ্রন্থ অনুবাদ করার ফলে তাঁর বাণিজ্যিক বা নৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আর শরিয়তসম্মত কোনো অধিকার অন্যায়ভাবে হরণ বা ভোগ করা বৈধ নয়। তাই লেখকের অনুমতি ছাড়া তাঁর গ্রন্থ অনুবাদ করা জায়েয নয়।
দ্বিতীয় মত: অনুবাদ একটি স্বতন্ত্র সৃজনশীল কর্ম (অনুমতি ব্যতিরেকেই বৈধ) অন্য একদল ফকীহের মতে, অনুবাদ কেবল মূল রচনার ভাষাগত রূপান্তর নয়; বরং এটি একটি স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কর্ম। মূল লেখক মূল রচনার মেধাস্বত্বের অধিকারী হলেও, অনূদিত ভাষায় মূল বক্তব্যকে যথাযথভাবে রূপান্তর করা, ভাষার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা এবং অর্থের যথার্থতা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রে অনুবাদকের নিজস্ব মেধা ও শ্রম রয়েছে। ফলে অনূদিত রচনার ওপর অনুবাদকেরও স্বতন্ত্র মেধাস্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই মতের অন্যতম প্রধান সমর্থক ও প্রবক্তা হলেন শায়খ বকর ইবন আবদুল্লাহ আবু যায়েদ রহ.। তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফিকহুন নাওয়াযিল-এ ‘حق الترجمة’ (অনুবাদস্বত্ব) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া বানূরী টাউনসহ দেওবন্দি ঘরানার আরও অনেক আলেমও এ মতের সমর্থক ও প্রবক্তা।
শায়খ বকর আবু যায়েদ রহ.-এর ফিকহি বিশ্লেষণ
শায়খ বকর আবু যায়েদ রহ. মূল লেখকের অনুমতি ছাড়া অনুবাদের বৈধতার পক্ষে কয়েকটি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন:
ক. অনুবাদের সৃজনশীল ও শ্রমসাধ্য প্রকৃতি
অনুবাদ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন—
“অনুবাদককে এমন পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়, যেমনটি মূল গ্রন্থের লেখক তাঁর গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে করেছেন। তাঁকে মূল গ্রন্থের অন্তর্নিহিত অর্থের সঙ্গে সর্বোচ্চ সামঞ্জস্য রেখে তা অনূদিত ভাষার কাঠামোর মধ্যে প্রকাশ করতে হয় এবং সেই ভাষার বৈশিষ্ট্য ও অর্থগত দিকগুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়। এ কারণেই অনুবাদকর্মকে একটি স্বতন্ত্র সৃজনশীল রচনা হিসেবে অভিহিত করা যথার্থ।”—ফিকহুন নাওয়াযিল, ২/১৬২
খ. শরয়ী জ্ঞান প্রচারের দায়িত্ব (دعوة وإبلاغ العلم)
জ্ঞান, বিশেষ করে শরীয়তের মৌলিক ইলম সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছানো একটি শরয়ী দায়িত্ব। তিনি বলেন—
«واجب إبراء العهدة بنشر العلم وإشاعة وإبلاغ الرسالة إلى العالمين بألسنتهم، وهذا في خصوص العلوم الشرعية.»
‘বিশেষত শরীয়তসংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের নিজ নিজ ভাষায় প্রচার ও বিস্তার করা এবং বিশ্ববাসীর কাছে তাদের নিজস্ব ভাষায় আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেওয়া মুসলিম উম্মাহর একটি মৌলিক দায়িত্ব।’
গ. সিদ্ধান্তের সারসংক্ষেপ ও শরয়ী সিদ্ধান্ত
উপরিউক্ত দুটি ভিত্তির ওপর নির্ভর করে শায়খ বকর আবু যায়েদ রহ. তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন:
«لهذه الاعتبارات فإنه ليس من حق المؤلف الأصل المطالبة بحماية حقه المالي في التأليف، وعليه فيجوز للمترجم - بكسر الجيم - ترجمة كتاب ما إلى لغة أخرى من غير إذن مؤلفه، لكن مع الاحتفاظ لمؤلفه الأصل بحقوق أدبية من نسبة مؤلفه إليه والمحافظة على مادته وعنوانه.»
‘এসব বিবেচনায় মূল লেখক তাঁর রচনার (অন্য ভাষায় অনুবাদের ওপর) আর্থিক স্বত্ব সংরক্ষণের দাবি করতে পারেন না। তাই তাঁর অনুমতি ছাড়াই কোনো গ্রন্থ অন্য ভাষায় অনুবাদ করা জায়েয। তবে লেখকের সাহিত্যিক ও নৈতিক অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ, গ্রন্থটি তাঁর রচনা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং এর মূল বিষয়বস্তু ও শিরোনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।’—ফিকহুন নাওয়াযিল, ২/১৬২
অনুবাদের স্বাধীনতা ও নৈতিক আমানতদারি (সীমা ও শর্তাবলি)
শায়খ বকর আবু যায়েদ রহ.-এর মতামত বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, অনুমতি ছাড়া অনুবাদ করার বৈধতা কোনো অসীম বা অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার ও আমানতদারির স্বার্থে অনুবাদককে নিম্নোক্ত নৈতিক ও শরয়ী শর্তাবলি অবশ্যই মেনে চলতে হবে:
১. নৈতিক অধিকার রক্ষা (الاعترافبالحقالأدبي):
গ্রন্থটি মূল লেখকের রচনা হিসেবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। কোনোভাবেই অনুবাদকে নিজের মৌলিক রচনা দাবি করা যাবে না।
২. বক্তব্যের আমানতদারি (الأمانةالعلمية):
মূল লেখকের মূল বক্তব্য, উদ্দেশ্য বা শিরোনামে কোনো ধরনের বিকৃতি (Distortion) বা পরিবর্তন আনা যাবে না।
৩. জ্ঞানগত বিশুদ্ধতা বজায় রাখা:
ভুল অনুবাদ বা মূল লেখকের ভাবার্থ ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো রূপান্তর শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে চরম খিয়ানত হিসেবে গণ্য হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, লেখকের অনুমতি ছাড়া অনুবাদ করা আর বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার বা স্বত্ব লঙ্ঘন করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ইসলামি আইনবিদদের এক বড় অংশের মতে, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও অনুবাদের স্বকীয় সৃজনশীলতার কারণে অনুমতি ছাড়া অনুবাদের শরয়ী বৈধতা রয়েছে। তবে এই স্বাধীনতা অনুবাদককে লেখকের প্রতি আমানতদারি, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একাডেমিক সততা রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত করে না।
والله أعلم بالصواب