দীর্ঘদিনের ‘স্ট্রংম্যান’ ভাবমূর্তির বাইরে গিয়ে এবার তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কৌশল নিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে তার অ্যাকাউন্টে সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে তুলনামূলক ব্যক্তিগত ও স্বতঃস্ফূর্ত ভিডিও। ‘গেট রেডি উইথ মি’ ধরনের ভিডিও থেকে শুরু করে সেলফি স্টাইলে তরুণদের উদ্দেশে বক্তব্য এবং জেন জি প্রজন্মের প্রচলিত ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন ৭৫ বছর বয়সি এই নেতা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাস আগেও মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ছিল অনেক বেশি পরিকল্পিত ও আনুষ্ঠানিক। এখন সেই জায়গায় ব্যক্তিগত ধাঁচের ভিডিও যুক্ত হয়েছে। দিল্লির একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে জেন জি প্রজন্মের জনপ্রিয় ভাষা ও ভঙ্গি ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের পর বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশলে এই পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ব্যঙ্গাত্মক ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওই আন্দোলন মিম, লাইভস্ট্রিম ও ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনুরাগ মিনাস ভার্মার মতে, বিজেপি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও এক্সের মাধ্যমে শক্তিশালী অনলাইন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। তবে তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতি ও অনলাইন কনটেন্ট ভিন্নভাবে গ্রহণ করছে। ভারতের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে হওয়ায় ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া জেন জি ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইনস্টাগ্রামে মোদির নতুন ধরনের ভিডিও প্রকাশের পর অবশ্য শুরু হয় ব্যঙ্গ ও সমালোচনা। প্রথম সেলফি স্টাইলের ভিডিওতে আলো, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ও উপস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠাট্টা করা হয়। পরবর্তী ভিডিওগুলোতে মোদির টিম ক্যামেরার অবস্থান, আলো ও পেছনের দৃশ্য পরিবর্তন করে উপস্থাপনায় বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করে।
তরুণদের একটি অংশ অবশ্য এসব উদ্যোগকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। ২২ বছর বয়সি গিনি মালিয়ার মতে, তরুণদের কাছে বিজেপির পৌঁছানোর চেষ্টা বোঝা গেলেও হঠাৎ করে তাদের প্রতি এই আগ্রহের কারণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার দাবি, ভিডিওগুলোতে জেন জি প্রজন্মের ভাষা ও ফরম্যাট ব্যবহার করা হলেও শিক্ষার্থী আন্দোলনের পেছনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা নেই।
বিজেপির দলীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজগুলোতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মিম, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও তরুণদের প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করে বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। আন্দোলন শেষ হওয়ার পর একটি জিমের দৃশ্য ব্যবহার করে তরুণদের বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকার বার্তা দেওয়া হয়। তবে ভিডিওটির নিচে অনেক ব্যবহারকারী সেটিকে ‘ক্রিঞ্জ’ বা অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করেন। অন্য একটি ভিডিওতে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘ফ্রেন্ডস’ এর গান ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী তরুণদের পাশে আছেন বলে বার্তা দেওয়া হয়। তবে সেটিও প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইনস্টাগ্রামে তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং রাজনৈতিক বার্তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এক বিষয় নয়। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়োজিত পাল বলেন, এক্স ও হোয়াটসঅ্যাপে বিজেপির দীর্ঘদিনের সমর্থক নেটওয়ার্ক থাকলেও ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম ভিন্নভাবে কাজ করে। ভিডিও কতক্ষণ দেখা হচ্ছে, পুনরায় দেখা হচ্ছে কি না, শেয়ার ও মন্তব্য কতটা হচ্ছে এসব বিষয় কনটেন্টের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মোদির প্রথম ইনস্টাগ্রাম রিলটি ৪০ কোটির বেশি বার দেখা হলেও এর একটি বড় অংশ তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক সম্পাদিত ভিডিওর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মূল বার্তার বাইরে ভিডিওটির ভিন্ন অর্থও তৈরি হয়েছে। ভার্মার মতে, ইনস্টাগ্রাম ব্যঙ্গ ও রসিকতাপ্রবণ প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বক্তব্যও সহজেই ট্রলের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে এই কৌশলের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। তাদের মতে, বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য এখনও দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও দীর্ঘদিনের সমর্থকভিত্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেন জি প্রজন্মের একটি বড় অংশ কোনো দলকে অপছন্দ করলেও সেটি সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইনস্টাগ্রাম ও জেন জি প্রজন্মের নতুন যোগাযোগভাষার সঙ্গে বিজেপির মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি