যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটের জমকালো মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওদের ডেকে আরও দ্রুত অস্ত্র তৈরির নির্দেশ দেন, তখনই আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যটি প্রকাশ পেয়ে যায়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে পাশে নিয়ে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শিল্পখাত পুনরুজ্জীবনের হুংকার দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালে ইরানে যে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তা মার্কিন অস্ত্রাগারকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
চলতি বছরের সেই ভয়াবহ অভিযানে মার্কিন বাহিনী ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং প্রায় ১৭ শতাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এই বিধ্বংসী সংঘাতের পেছনে পেন্টাগনের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার, যার সিংহভাগই গায়েব হয়েছে গোলাবারুদ আর ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নতুন করে সংঘাত না বাড়ানোর পরামর্শ পাওয়ার পরেই ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতির পথ বেছে নেওয়া, কারণ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ওয়াশিংটনের অস্ত্রাগার পুরোপুরি শূন্য হয়ে যেত।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন ঘাটতির তথ্য সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্র জমা আছে কিন্তু পেন্টাগনের ভেতরের থমথমে বাস্তবতা অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইতিমধ্যেই সিনেটের অর্থ বরাদ্দ কমিটির কাছে পেন্টাগনের জরুরি ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বিশাল তহবিল চেয়েছেন। পেন্টাগনের এই বিপুল অর্থ দাবির ঘটনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে আপাত নিরাপত্তার আড়ালে মার্কিন অস্ত্রাগার কতটা দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে। জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ানের মতে, একটি দূরপাল্লার টমাহক বা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় এবং আজ বিশাল অর্থ ঢাললেও সেই ঘাটতি মেটাতে লেগে যাবে বহু বছর। ইরান যুদ্ধে এক হাজারের বেশি টমাহক এবং অর্ধেকেরও বেশি প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ফেলার পর, পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী ২০৩১ সালের আগে কোনোভাবেই এই সংঘাত-পূর্ব অস্ত্রের মজুতে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।
এই তীব্র অস্ত্রসংকট যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বলয়কে এক বিরাট ‘ঝুঁকিপূর্ণ সময়সীমার’ মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ডেভিডসন উইন্ডো’, ঠিক সেই সময়সীমাতেই অর্থাৎ ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের জন্য বেইজিং পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যদি চীনের বিশাল আকাশ ও নৌবহরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বেঁধে যায়, তবে প্রয়োজনীয় ও পছন্দের অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে মার্কিন বাহিনী এক চরম অপ্রস্তুত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়বে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নয়, বিপরীত দিকে ইরানের অবস্থা করুণ। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির মূল সামরিক অবকাঠামো প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, ফলে সামরিক শক্তির বিপুল ঘাটতি পূরণ করার ক্ষমতা তাদের প্রায় নেই বললেই চলে। তবে ওয়াশিংটন আপাতত যে বাজি ধরেছে তা হলো, হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে নিজেদের রণকৌশল টিকিয়ে রাখতে তাদের বর্তমান অবশিষ্ট অস্ত্রই যথেষ্ট এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্প পুরোদমে চালু হওয়ার আগেই তারা এই আন্তর্জাতিক সংকট সামলে নিতে পারবে।
ডেস্ক রিপোর্ট