ঋণ বিতরণ করতে না পেরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হিসাবে জমা রাখছে, যেখানে তুলনামূলক কম সুদ পাওয়া যায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, সরকারি ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগের পরও ব্যাংকগুলোর হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত থাকছে। সরকারের চাহিদার তুলনায় বেশি আবেদন জমা পড়ায় ট্রেজারি বিলের সুদহারও কমছে। ফলে ট্রেজারি বিল থেকে ব্যাংকগুলোর আয় কমেছে।
কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আমানতের সুদহার কমানোর পাশাপাশি আমানত সংগ্রহও কমিয়ে দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের অতিরিক্ত তারল্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এসডিএফ হিসাবে জমা রাখতে পারে। এর বিপরীতে তারা বর্তমানে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে সুদ পাচ্ছে, যা কল মানির চেয়ে অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ এপ্রিল ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ, ১৮২ দিনের বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহার ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সবশেষ ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত নিলামে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার নেমে আসে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ শতাংশ নীতিসুদের নিচে।
একই সময়ে ১৮২ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহার হয় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
অথচ এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এসডিএফ হিসাবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা জমা রেখেছে, যা এযাবৎকালের রেকর্ড।
ফেব্রুয়ারিতে এসডিএফ হিসাবে নতুন করে প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মার্চে ৫৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং এপ্রিল ও মে—উভয় মাসে প্রায় ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা করে জমা হয়।
সবশেষ ২৩ জুলাই এক দিনেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এসডিএফ হিসাবে আরও ৬ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা জমা রাখে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মে মাসে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মত।
ব্যাংকারদের উদ্বেগ:
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ায় ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্যের চাপ বাড়ছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “সঞ্চয় বা আমানত সংগ্রহ এখন অনেক ব্যাংকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। আমানতের পেছনে যে ব্যায় হয়, অর্থাৎ সুদ ও খরচ–তা বাদ দিলে ব্যাংক তেমন কোনো লাভই করছে না।”
তিনি বলেন “কিছু স্বল্প সুদের আমানত থাকায় গড়ে এখনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু এভাবে চললে প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।”
তার ভাষ্য, এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকগুলোকে আমানত ও ঋণ—উভয় সুদহারই কমাতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে গেলে আমানতকারীদের প্রকৃত আয় ঋণাত্মক হয়ে যাবে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিনিয়োগবিহীন তারল্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ঋণ দেওয়া ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও আমানত সংগ্রহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
“গ্রাহক আমানত রাখতে এলে তা গ্রহণ করতেই হয়। এখন সেই আমানতই অনেক ব্যাংকের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে অনেকে সুদহারকে প্রধান কারণ হিসেব দেখালেও এটি একটি কারণ হতে পারে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা ও শিল্প উৎপাদনের ধীরগতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঋণ প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের নিচে:
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে। অন্যদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি এক বছর আগের ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, “ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য জমছে। এখন আমদানি বাড়লে ঋণের চাহিদাও বাড়বে। ইতোমধ্যে তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “এটা সাময়িক সমস্যা। এখন তো বর্ষার সময়। ঋণ কমই যাবে। বছরের শেষ প্রান্তিক থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে, তখন এই সমস্যাও কেটে যাবে।”
ডেস্ক রিপোর্ট