তাই যে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামের পর্দার বিধান লংঘন হয়, সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলাম সমর্থন করে না। নারী-পুরুষ আলাদা অবস্থানে থেকে পর্দা রক্ষা করে শিক্ষা অর্জন করবে-এটাই ইসলামের চিরন্তন বিধান। নারীদের পর্দার বিষয় ইসলামে সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত সহশিক্ষা কুরআন মজীদের মৌলিক নির্দেশনা পরিপন্থী। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ وَمَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْ تَنْكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِنْ بَعْدِهِ أَبَدًا إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمًا অর্থ : আর তোমরা তাঁর (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (সূরা আহযাব-৫৩)
বিখ্যাত তাফসীরবিদ ইমাম কুরতুবী রহ. উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। সাধারণ নারীরাও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসীরে কুরতুবী ১৪/১৪৬)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ হলেন সকল মু’মিনের মা। অথচ তাঁদের সাথেই লেনদেন বা কথা-বার্তা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে বলা হয়েছে। তাহলে অন্যান্য সাধারণ বেগানা নারীদের ক্ষেত্রে হুকুমটি কত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত তা তো সহজেই অনুমেয়।
আর প্রচলিত সহশিক্ষার ফলে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান পর্দার লংঘন হচ্ছে। যেটাকে অনেকে গোনাহের কাজই মনে করতেছে না! পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী…।’ [আলে ইমরানে-১৪] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—‘আমি আমার পরে মানুষের মাঝে পুরুষদের জন্য নারীদের চাইতে অধিকতর ক্ষতিকর কোন ফিতনা রেখে যাই নি।’ [সহীহ বুখারী-৪৮০৮, মুসলিম-২৭৪০]
সহশিক্ষা প্রসঙ্গে সৌদি আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেন—
اختلاط الطلاب بالطالبات والمدرسين بالمدرسات في دور التعليم محرم لما يفضي إليه من الفتنة وإثارة الشهوة والوقوع في الفاحشة ، ويتضاعف الإثم وتعظم الجريمة إذا كشفت المدرسات أو التلميذات شيئاً من عوراتهن ، أو لبسن ملابس شفافة تشف عما وراءها ، أو لبسن ملابس ضيقة تحدد أعضاءهن ، أو داعبن الطلاب أو الأساتذة ومزحن معهم أو نحو ذلك مما يفضي إلى انتهاك الحرمات والفوضى في الأعراض
‘বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানকালীন ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকার সহাবস্থান হারাম। কেননা—এটি ফেতনা, অবাধ যৌনতা ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। এক্ষেত্রে যখন শিক্ষিকারা কিংবা ছাত্রীরা নিজেদের সতরের কোনো অংশ খোলা রাখে কিংবা অন্যের সামনে পিনপিনে পোশাক, অঙ্গভঙ্গী প্রকাশক আঁটসাঁট জামা পরিধান করে কিংবা তারা যখন ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্রা ইত্যাদি করে তখন পাপাচার আরো বৃদ্ধি পায় এবং অপরাধ আরো বিশাল হয়ে ওঠে; যা সম্ভ্রমহানি ও ইজ্জত লুণ্ঠন পর্যন্ত গড়ায়।’ [ফাতাওয়া লাজনাতিদ্দায়িমা ১৭/৫৩]
ফাতাওয়া লাজনাতিদ্দায়িমাতে আরো বলা হয়েছে—
فلا يجوز للمرأة أن تَدرس أو تعمل في مكان مختلط بالرجال والنساء ، ولا يجوز لوليها أن يأذن لها بذلك
‘সুতরাং মেয়েদের জন্য এমন প্রতিষ্ঠানে পড়া-লেখা কিংবা চাকরি করা জায়েয হবে না যেখানে নারী- পুরুষের সহাবস্থান রয়েছে এবং অভিবাভকের জন্য জায়েয হবে না তাকে এর অনুমতি দেয়া।’ (ফাতাওয়া লাজনাতিদ্দায়িমা ১২/১৫৬)
এ প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগের ওয়েবসাইটে এসেছে—
سوال: مخلوط تعلیم اسلام میں جائز ہے کہ نہیں؟کیوں کہ آج کل ساری یونیورسٹیاں مخلوط تعلیم کا نظام رکھتی ہیں، تو ہم اعلی تعلیم کیسے حاصل کریں؟ جواب نمبر: 991— جب لڑکے اور لڑکی بالغ یا قریب البلوغ ہوجائیں تو اب ان کے لیے ایک ساتھ بغیر حجاب و پردہ کے تعلیم حاصل کرنا درست نہیں رہتا، (فتوى: 398/م = 394/م)
প্রশ্নঃ ইসলামে সহশিক্ষা জায়েজ কি না? কারণ আজকাল সব বিশ্ববিদ্যালয়ই সহশিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে, তাহলে আমরা কিভাবে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারি? উত্তরঃ—যখন ছেলে-মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক অথবা এর কাছাকাছি বয়সে পৌছে যায়, তখন তাদের জন্য হিজাব ও পর্দা লংঘন করে এক সাথে পড়াশুনা করা জায়েয নয়।
দারুল উলুম করাচীর ফতোয়া বিভাগের ওয়েবসাইটে এসেছে—
‘সহশিক্ষা বা মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় দিক থেকে অনেক ক্ষতি রয়েছে, তাই এই ব্যবস্থার অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করা মহিলাদের জন্য জায়েজ নয়। যদিও কোনো নারী পর্দা সহকারে বসে শিক্ষা অর্জন করে।’....[ফাতাওয়া নং ৩৮]
বাংরাদেশের প্রসিদ্ধ ফাতাওয়া বিভাগ মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার ওয়েবসাইটে এসেছে—
‘সহশিক্ষা তথা নারী-পুরুষের যৌথ শিক্ষা-ব্যবস্থা ইসলাম সমর্থিত নয়। এটি বিজাতীয় শিক্ষা-পদ্ধতি। একসময় স্কুল-কলেজেও আলাদা ব্যবস্থা ছিল।
পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের অনুকরণে সহশিক্ষা চালু করা হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন আলিয়া পদ্ধতির দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা সম্পূর্ণ নাজায়েয এবং ইসলামের মূলনীতি পরিপন্থী।
মেয়েরা বোরকা পরা থাকলেও সহশিক্ষা ব্যবস্থা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পাঠশালায় একজন ছাত্রী শুধু নীরব শ্রোতা নয়; তাকে যেমন শিক্ষকের কথা শুনতে হয়, তেমনি পড়া শুনাতে হয় এবং প্রয়োজনে প্রশ্নও করতে হয়। এমনিভাবে তাকে লেখা দেখাতে হয়, বাড়ির কাজ দেখাতে হয়। এসব কিছুই হয়ে থাকে তার সহপাঠি বেগানা ছাত্রদের কাছে বসে এবং বেগানা পুরুষ শিক্ষকের সাথে সামনাসামনি ও সরাসরি।’ [মাসিক আল কাউসার থেকে। অক্টোবর-২০১১]
জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউন করাচীর ফাতাওয়া বিভাগের ওয়েবসাইটে এসেছে—
‘‘ছেলে-মেয়েদের এক সাথে পড়ানো হয় এ ধরনের সহশিক্ষা মূলক প্রতিষ্ঠান শরিয়তের পরিপন্থী। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তাতে নিম্মোক্ত ক্ষতি রয়েছে—
১. অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে—এক কক্ষে বেগানা নারী-পুরুষ এক সাথে অবস্থান করতে হয় এবং তখন তৃতীয় কোনো ব্যক্তি সেখানে থাকে না। এ ধরণের নির্জন অবস্থান কোনো বেগানা নারীর সাথে বৈধ নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, أَلاَ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। [তিরমিজী-২১৬৫]
২. এসব প্রতিষ্টানে গাইরে মাহরাম নারীদের চেহারার দিকে তাকানোর মতো পরিস্থির সম্মুখীন হতে হয়। আর শরীয়তে তীব্র জরুরত ছাড়া কোনো পুরুষের জন্য বেগানা নারীর দিকে তাকানো বৈধ নয়।
তাই সহশিক্ষা জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ সংমিশ্রণ হয়ে থাকে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা জায়েয নয়। শরীয়তের বিধিনিষেধ ছাড়াও সমাজের তাকাযাও এটা যে—নারী-পুরুষের প্রত্যেকের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা আলাদা হোক।’’ [বিন্নুরি ওয়েবসাইট ফাতাওয়া 144001200324]
[সুরা নুর আয়াত ৩০,৩১, ফাতাওয়ায়ে শামী ২/৭৯, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/৩২৮, আল আশবাহ ওয়ান নাযাইর ১/১৪৮,দুররে মুখতার ৫/২৬০, ফাতাওয়ায়ে শামী ৫/২৩৬]
সংগৃহীত- Khairul Islam, হানাফী ফিকহ ফেসবুক গ্রুপ থেকে
ডেস্ক রিপোর্ট