বৃহস্পতিবার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো সংস্থাটির সর্বশেষ গোপন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করার পর এটিই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আইএইএ’র প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনে সংস্থাটি আবারও তেহরানের কাছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের অবস্থান সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছে, যার একটি অংশের হিসাব প্রায় এক বছর ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।
আইএইএর মতে, গত বছরের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের প্রধান কয়েকটি পরমাণু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে নিম্নমাত্রায় ও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি বড় অংশের অবস্থান যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস ছিল হামলার অন্যতম লক্ষ্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করাই সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।
তবে আইএইএ’র সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, যুদ্ধ ও বিমান হামলার পরও সংস্থাটির পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণের তুলনায় বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন শনাক্ত হয়নি।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনার অন্যতম প্রধান অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন চায় ইরান সম্পূর্ণভাবে এ মজুদ ত্যাগ করুক। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর দিকে কেন্দ্রীভূত, যেখানে পরমাণু ইস্যুগুলো পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হতে পারে।
আইএইএ’র উদ্বেগ: ইউরেনিয়ামের অবস্থান অজানা
আগামী সপ্তাহে আইএইএ’র ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট বোর্ড অব গভর্নরসের ত্রৈমাসিক বৈঠকের আগে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনের একটিতে বলা হয়েছে, ইরানকে অবশ্যই পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী তার নিরাপত্তা ও তদারকি সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “আইএইএ’র মহাপরিচালক ইরানকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, এনপিটি সুরক্ষা চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য এবং জরুরি। কোনও পরিস্থিতিতেই ইরান একতরফাভাবে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করতে পারে না।”
আইএইএ জানিয়েছে, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে সংস্থাটির পরিদর্শকরা এখনও ফিরে যেতে পারেননি। ফলে সেখানে থাকা ইউরেনিয়ামের প্রকৃত অবস্থান যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষ করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্রমানের (প্রায় ৯০ শতাংশ) ইউরেনিয়াম তৈরির জন্য একটি সংক্ষিপ্ত প্রযুক্তিগত ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘প্রসারণ ঝুঁকি’ নিয়ে সতর্কবার্তা
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রায় এক বছর ধরে আইএইএ পূর্বঘোষিত ইউরেনিয়াম মজুদ যাচাই করতে না পারায় এটি পরমাণু অস্ত্র বিস্তারসংক্রান্ত গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং এনপিটি সুরক্ষা চুক্তি পালনের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সংস্থাটি বলেছে, দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট উপাদানের অবস্থান সম্পর্কে ধারাবাহিক জ্ঞান হারিয়ে যায়। এতে পরমাণু উপকরণের গতিপ্রকৃতি ও ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
আইএইএর ভাষ্য, “ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে পূর্বে ঘোষিত পরমাণু উপাদান সম্পর্কিত ধারাবাহিক তথ্য ও তদারকির যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সর্বোচ্চ জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা প্রয়োজন।”
বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত করছে যে, সামরিক হামলার পরও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। সূত্র: রয়টার্স
ডেস্ক রিপোর্ট