রাজশাহীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের সঙ্গে সুপেয় পানির চাহিদাও বেড়েছে। বর্তমানে নগরীতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানির ঘাটতি রয়েছে এবং সেই চাহিদা পূরণে মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ২০১৮ সালে একনেক সভায় ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্প অনুমোদন পায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়।
প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হচ্ছে ইনটেক পয়েন্ট, যেখানে থেকে পানি সংগ্রহ করা হবে। এর পাশে নির্মিত হচ্ছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন মূল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। পাশাপাশি পবা উপজেলার হরিপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বুস্টার প্ল্যান্ট, যেখান থেকে পরিশোধিত পানি শহরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন পাইপলাইন স্থাপনের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম জানান, প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন শ্রমিক কাজ করছেন এবং সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মামুদ বলেন, ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য পানির চাহিদা বিবেচনায় রেখে প্ল্যান্টের সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান পাইপলাইনের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ২১ কিলোমিটার স্থাপন করা হয়েছে।
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজশাহী মহানগরে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি ৩২ লাখ লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। নতুন প্রকল্প চালু হলে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং শহরের পানির ঘাটতি দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, পদ্মা নদীর ইনটেক এলাকায় সারা বছর অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল বলেন, বারিন্দ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। তাই পদ্মার পানি শোধন করে সরবরাহের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি নগরীর পানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড। মোট ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা এবং চীনা অংশীদার প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণসামগ্রী, আধুনিক পানি শোধন প্রযুক্তি এবং উন্নতমানের পাইপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় শ্রমিক, প্রযুক্তিবিদ, পরিবহন খাত ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের আশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে রাজশাহীর নাগরিকরা নিরাপদ ও পর্যাপ্ত সুপেয় পানির সুবিধা পাবেন এবং ভবিষ্যতের পানির চাহিদা মোকাবিলায় শহরটি আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
ডেস্ক রিপোর্ট