ভারতের আসামের ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের ঢাকার পুরোনো নৌপথে আবারও পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। প্রায় ৭০ বছর পর সোমবার (৫ অক্টোবর) ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের একটি পণ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।
ডিব্রুগড়ের বোগিবিল থেকে যাত্রা করা জাহাজটির গন্তব্য ঢাকার পানগাঁও বন্দর। ভারতের নামরুপে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডে উৎপাদিত মিথানল নিয়ে এটি ব্রহ্মপুত্রের জাতীয় জলপথ-২ দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর প্রটোকল রুট অনুসরণ করে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় যাওয়ার কথা রয়েছে। বোগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নৌযাত্রার মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রকে আবারও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
নৌযাত্রার উদ্বোধন করেন ভারতের নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সোনোয়াল বলেন, একসময় ডিব্রুগড় ঘাট নদীপথের বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর আন্তর্জাতিক গন্তব্যে পণ্যবাহী জাহাজের যাত্রা ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
ব্রিটিশ আমলে ডিব্রুগড়ের নৌপথ দিয়ে চা, কাঠ ও কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য কলকাতায় পরিবহন করা হতো। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে চলাচল শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে নিয়মিত স্টিমার চলাচলও ছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যাওয়া নৌপথটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ ও নাব্যতায় পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ডিব্রুগড়ের স্টিমার ঘাট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
পরে ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্য ও নৌপরিবহনের জন্য প্রটোকল সই করে। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে দুই দেশের মধ্যে সীমান্তপারের নৌবাণিজ্য পুনরায় গতি পেতে শুরু করে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, এবারের মিথানল পরিবহনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য বাংলাদেশ হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। ইতোমধ্যে বোগিবিল ও ধুবরিতে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে এ নৌপথে নিয়মিত আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানো গেলে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি মহাসড়কে ভারী যানবাহনের চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের নৌপথ উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক নৌসংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ সাত দশক পর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে ডিব্রুগড় থেকে ঢাকার পথে পণ্যবাহী জাহাজের এই যাত্রা তাই পুরোনো নৌবাণিজ্যপথ পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তৈরি করছে।