জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহযোগিতার অভিযোগে করা মামলায় রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার এই রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
রায়ের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আপিল করবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি জানান, আপিলের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন ইনুর সাজার বিষয়ে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর আগে ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। তাঁর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটিতে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সাজাগুলো একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় মোট ১০ বছরই কারাভোগ করতে হবে তাঁকে। পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযোগে জরিমানার আদেশও দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অভিযোগে তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগেও তাঁর দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। প্রতিটি অভিযোগে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সব সাজা একসঙ্গে কার্যকর হবে।
অন্যদিকে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এসব অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু জুলাই আন্দোলনকারীদের নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগে উসকানি, প্ররোচনা ও সহযোগিতার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং ইনু বৈঠকে উপস্থিত থেকে তা বাস্তবায়নে নির্দেশনা ও সহায়তা করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে খালাস দেন।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরির উদ্যোগ এবং তাদের আটক ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে ইনু জড়িত ছিলেন। এই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থ অভিযোগে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, ছত্রীসেনা মোতায়েন এবং হেলিকপ্টার থেকে বোমা হামলার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। পঞ্চম অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়। তবে এই দুই অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি।
ষষ্ঠ অভিযোগে ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনুর ভূমিকার অভিযোগ আনা হয়। সপ্তম অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। ট্রাইব্যুনাল উভয় অভিযোগই প্রমাণিত বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন।
অষ্টম অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারী ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনকে হত্যায় নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। একই অভিযোগে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ইনুকে তা থেকে খালাস দেওয়া হয়।
এদিকে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা পৃথক মামলাতেও হাসানুল হক ইনুর বিচার কার্যক্রম চলছে। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তথ্যমন্ত্রী থাকাকালে তিনি শাপলা চত্বরের ঘটনায় কোর কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।