কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দ্রুত অগ্রসর হলেও নতুন এক জাতিসংঘ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই সিস্টেমগুলো মানবসমাজের দীর্ঘদিনের বর্ণবৈষম্য, কুসংস্কার ও পক্ষপাতও আত্মস্থ করছে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সামাজিক বৈষম্যকে আরও বিস্তৃত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জাতিসংঘের বিশ্লেষণে ১৩৩টি এআই সিস্টেম পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রায় ৪৪ শতাংশে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত রয়েছে। পাশাপাশি ২৭ শতাংশের বেশি সিস্টেমে একই সঙ্গে লিঙ্গ ও জাতিগত পক্ষপাত লক্ষ্য করা গেছে। এসব ফলাফল এআই প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহৎ ভাষাভিত্তিক মডেলগুলো (এলএলএম) নারীদের সাধারণত পরিবার ও গৃহকেন্দ্রিক ভূমিকায় উপস্থাপন করে, আর পুরুষদের দেখায় নেতৃত্ব, ব্যবসা ও পেশাগত সাফল্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে। কিছু ক্ষেত্রে নারীদের যৌন বস্তু বা পুরুষের অধীনস্থ হিসেবেও তুলে ধরার প্রবণতা দেখা গেছে।
নারীর অধিকার ও সমঅধিকার নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেন জানায়, গবেষণায় দেখা গেছে—শুধু লিঙ্গ উল্লেখ করে বাক্য সম্পূর্ণ করতে দিলে প্রায় প্রতি পাঁচটি উত্তরের একটিতে নারীবিদ্বেষী বা বৈষম্যমূলক ভাষা পাওয়া যায়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নারীদের সম্পত্তি বা বস্তু হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইমেইল লেখা, প্রেজেন্টেশন তৈরি, কনটেন্ট প্রোডাকশনসহ নানা কাজে এআই ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান সামাজিক পক্ষপাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং এআই ইন্টারনেটে বিদ্যমান বিপুল তথ্য থেকে শেখে, যেখানে বহু বছরের সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে প্রশিক্ষণের সময় এই পক্ষপাতগুলোও মডেলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
ইউএন উইমেনের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান জয়াথমা উইক্রমনায়েকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সমাজে নারীদের গৃহকেন্দ্রিক এবং পুরুষদের কর্মজীবনকেন্দ্রিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—এআই সেই ধারণাগুলোই পুনরায় প্রতিফলিত করছে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির ঝুঁকি আগে থেকেই বেশি ছিল, এবং এআই সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জরিপ অনুযায়ী, প্রতি চারজন নারী মানবাধিকারকর্মী, কর্মী ও সাংবাদিকের মধ্যে একজন এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এদের মধ্যে ১২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আর ৬ শতাংশ ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের আহ্বান, এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি ধাপে লিঙ্গসমতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, বিভিন্ন জাতিগত ও সামাজিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এআই বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও জোরদার করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এআই মানুষের চেয়েও উন্নত হবে কি না—এই বিতর্কের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যা সমাজের নেতিবাচক পক্ষপাত পুনরুৎপাদন না করে বরং আরও ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
ডেস্ক রিপোর্ট