মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিরীহ মানুষের নামে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো এবং একই সঙ্গে জাল কাস্টডি ওয়ারেন্ট ব্যবহার করে আসামিদের আদালতে আনার নামে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রমের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আদালত, কারাগার, পুলিশ ও আইনজীবী মহলের কিছু অসাধু ব্যক্তির সমন্বয়ে এ ধরনের জালিয়াতি পরিচালিত হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে আসামিদের নামে ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে এবং পরিকল্পিতভাবে নির্ধারিত তারিখ বসিয়ে তা কারাগারে পাঠায়। কারাগারের ভেতরে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে এসব নথি ওয়ারেন্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে কাগজপত্র অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে পাঠানো হলেও বাস্তবে তাকে আদালত কক্ষে হাজির না করে ভবনের অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়।
এভাবে নির্দিষ্ট কক্ষ বা স্থানে রেখে আসামিদের আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক, আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ, খাওয়াদাওয়া এমনকি গোপন বৈঠকের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হাজতখানা থেকে আনা এক আসামিকে আদালতে হাজির না করে ভবনের একটি রেকর্ড রুমে নেওয়া হয়েছে এবং টানা কয়েকদিন একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, যদিও ওই দিনগুলোতে তার কোনো নির্ধারিত হাজিরা ছিল না।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এসব সুবিধার বিনিময়ে আসামি বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মামলার ধরন ও সুবিধার মাত্রা অনুযায়ী অর্থ আদায় করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে জাল গ্রেফতারি পরোয়ানাও ব্যবহার করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার নামে ঢাকায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো হয়। পরে তিনি ঢাকায় এসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তার নামে জারি হওয়া পরোয়ানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহারেও তার নাম নেই। অনুসন্ধানে এমন আরও কয়েকটি জাল পরোয়ানার তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলো ডাকযোগে বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়েছিল।
পুলিশের যাচাইয়ে এসব পরোয়ানা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে না থাকায় সেগুলো ফেরত পাঠানো হলেও পরে যথাযথ যাচাই ছাড়াই ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে জাল নথিগুলো সরকারি রেকর্ডে ঢুকে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট থানায় পুনরায় পাঠানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের নির্ভুল ফরম্যাট, প্রক্রিয়া ও নথির আদলে এত নিখুঁত জালিয়াতি সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী, আইনজীবী এবং পুলিশের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
আইনজীবী নেতারা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।