ইতিকাফের ফাযায়েল ও মাসায়েল– মুফতি জসিমুদ্দীন (হাফি.)——————————وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ‘যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্যে সম্মেলনস্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্যে পবিত্র রাখো। (সূরা বাকারা : ১২৫)
ইতিকাফের পরিচয় ও ফযীলত—————–ইতিকাফ অর্থ, কোনো স্থানে নিজেকে আবদ্ধ করা। শরীয়তের পরিভাষায়, বিশেষ সময় ও নিয়মে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখা। অর্থাৎ যে সকল প্রয়োজনীয় কাজ মসজিদে সম্পাদন করা সম্ভব নয় যেমন পেশাব, পায়খানা, ওয়াজিব গোসল ইত্যাদি, এ সকল প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোনো কাজে মসজিদ থেকে বের না হয়ে, রমযান মাসের ২০ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত, পুরুষদের জন্য মসজিদে এবং মেয়েদের জন্য নিজ ঘরের নির্ধারিত নামাযের স্থানে, পাবন্দীর সাথে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে।
ইতিকাফ মানুষকে দুনিয়ার ঝামেলা ত্যাগ করার অভ্যাস শিক্ষা দেয়, অল্প কাজের জন্যে হলেও আল্লাহর সাথে তার সর্ম্পক জুড়িয়ে দেয়। এতে মানুষের জন্যে অন্তিমকালে দুনিয়া ত্যাগ করা সহজ হয় এবং দুনিয়ার মহাব্বতের স্থলে আল্লাহর মহাব্বত বৃদ্ধি পায়। ইতিকাফকারীর উদাহরণ হচ্ছে সেই মুখাপেক্ষী ব্যক্তির মত যে কোনো মহান ব্যক্তির দরবারে হাত পেতে বলে, যে পর্যন্ত না আমার হাজত পূর্ণ হয় আমি এই দরবার ত্যাগ করব না।
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে তিন খন্দক দূরে রাখবেন। প্রত্যেক খন্দকের দূরত্ব আসমান-যমীনের দূরত্বের চেয়েও বেশি। (তাবারানী ; বায়হাকী)
রাসূলে কারীম স. নিয়মিত ইতিকাফ করতেন। হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত-أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعتكف العشر الأواخر من رمضان حتى توفاه الله ثم اعتكف أزواجه من بعدهনবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বছর রমাযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন এমনকি তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর তার সম্মানিত স্ত্রীগণ ইতিকাফ করতেন। (ছহীহ বুখারী: হাদীস নং ২২২৬)
ইতিকাফের প্রকারভেদ—————ইতিকাফ তিন প্রকার। ক. ওয়াজিব, খ. সুন্নাত, গ. মুস্তাহাব।
ক. ইতিকাফ করার জন্যে মান্নত করলে বা সুন্নাত ইতিকাফ বিনা-কারণে ভেঙ্গে ফেললে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব। মান্নত দু’ধরনের হতে পারে।ক. সাধারণ মান্নত।খ. শর্তের সাথে সম্পর্কিত মান্নত।
সাধারণ মান্নত, যেমন কেউ বলল, ‘আমি অমুক তারিখে ইতিকাফ করার মান্নত করলাম।’ আর শর্তের সাথে সম্পর্কিত মান্নত, যেমন কেউ বলল, ‘আমার অমুক কাজ পূর্ণ হলে আল্লাহ তা’আলার জন্যে ইতিকাফ করবো।’ আর মান্নত সঠিক হওয়ার জন্যে মুখে মান্নতের কথা উচ্চারণ করা জরুরি। কেবল মনে মনে নিয়ত করার দ্বারা মান্নত সঠিক হয় না।
মান্নতের ইতিকাফ সঠিক হওয়ার জন্যে রোযা রাখা শর্ত। এমনকি কেউ যদি মান্নত করে যে, রোযা রাখা ব্যতীত আমি দশদিন ইতিকাফ করবো, তবুও ইতিকাফ আদায়কালে রোযা রাখতে হবে। ওয়াজিব ইতিকাফের হুকুম হলো, নিজের উপর থেকে ওয়াজিব আদায় হয় এবং সাওয়াব লাভ হয়।
খ. রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদা। আমাদের ফকীহগণ এ ইতিকাফকে ‘সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া’ বলেছেন। অর্থাৎ মসজিদের অধিবাসীদের মধ্যে কেউ ইতিকাফ করলে সকলে গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। আর কেউ আমল না করলে সকলে গুনাহগার হবে।
সুন্নাত ইতিকাফ রমযানের দশ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ এবং রমাযানের শেষ তারিখে সূর্যাস্তের পর মসজিদ হতে বের হতে হয়। মসজিদে চুপ করে বসে না থেকে নফল নামায, কুরআন তেলাওয়াত বা আল্লাহর যিকির করা উচিত। পাঞ্জেগানা মসজিদ যেখানে নিয়মিত জামাত হয় সেখানে ইতিকাফ করা জায়েয। তবে জুমার মসজিদে ইতিকাফ করা উত্তম। মহিলারা আপন ঘরে একটি স্থান নির্দিষ্ট করে সেখাানে ইতিকাফ করবে।
গ. ওয়াজিব ও সুন্নাত ইতিকাফ ছাড়া বাকী সকল ইতিকাফ মুস্তাহাব। মুস্তাহাব ইতিকাফ স্বল্প সময়ের জন্যেও হতে পারে।
ইতিকাফের শর্তাবলী——————-১. নিয়ত করা। নিয়ত ব্যতীত ইতিকাফ সহীহ হবে না।২. পুরুষের জন্যে এমন মসজিদ হতে হবে যেখানে জামাতের সাথে নামায আদায় করা হয়। তবে নফল ইতিকাফ যেকোনো মসজিদে হতে পারে। আর মহিলারা নিজেদের ঘরের নামায আদায়ের স্থানে ইতিকাফ করবে, তারা প্রয়োজন ব্যতীত সে স্থান থেকে বের হবে না।৩. রোযা রাখা। তবে নফল ইতিকাফের জন্যে রোজা রাখা শর্ত নয়।৪. মুসলমান হওয়া। কেননা কোনো অমুসলিম ব্যক্তি ইবাদতের যোগ্যতা রাখে না।৫. জ্ঞানবান বা বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া।৬. জানাবাত, হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া। কেননা নাপাকী অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা নিষেধ। স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ইতিকাফ করবে না। আর যদি স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ইতিকাফের মান্নত করে তাহলে স্বামীর অধিকার আছে স্ত্রীকে ইতিকাফ থেকে বিরত রাখার।
উল্লেখ্য, ইতিকাফ সহীহ হওয়ার জন্য বালেগ হওয়া শর্ত নয়। কেননা বিবেকবান ছোট শিশুর ইতিকাফও সহীহ। অনুরূপভাবে ইতিকাফ সহীহ হওয়া জন্যে আযাদ হওয়া শর্ত নয়; বরং গোলাম বা দাস-দাসীর ইতিকাফও সহীহ, মালিকের অনুমতিক্রমে।
ইতিকাফের আদবসমূহ————————যিকির, নফল নামায ও তিলাওয়াতে মগ্ন থাকা। এমনিভাবে হাদীস পাঠ, ইলম চর্চা, দ্বীনের দাওয়াত দেয়া, ঈমানী আলোচনা, নবী, সাহাবী ও আওলিয়াদের জীবনী পাঠে নিজেকে ব্যস্ত রাখা উত্তম। অনর্থক কথা ও খোশগল্পে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। সকল অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা। ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইলে কথা বলা, বেচাকেনা করা আদব পরিপন্থী, না করাই শ্রেয়। তবে অতি প্রয়োজনীতার ক্ষেত্রে অবকাশ আছে। ইতিকাফ অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে তায়াম্মুম করে মসজিদের আদব রক্ষা রেখে অতি তাড়াতাড়ি গোসল করে মসজিদে ফিরে আসবে। আর এই স্বপ্নদোষের কারণে ইতিকাফ ও রোযার কোনো ক্ষতি হবে না।
ইতিকাফ সম্পর্কিত কয়েকটি মাসআলা————————-মাসআলা: রমযানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। বড় শহরে প্রতিটি মহল্লার একজন এবং ছোট গ্রামে প্রতি পাড়া থেকে একজন করে ইতিকাফ না করলে এলাকার সকল লোক সুন্নাত পরিহার করার জন্যে দায়ী হবে। আর যদি মহল্লা বা পাড়া থেকে একজন ব্যক্তি ইতিকাফ পালন করে, তাহলে সকলের পক্ষ থেকে সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।
মাসআলা: ইতিকাফকারীর জন্যে একেবারে নীরব থাকা আবশ্যক নয়, বরং এটা মাকরুহ। তবে কারো সমালোচনা করা এবং ঝগড়া-বিবাদ ও অহেতুক গল্প-গুজব থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
মাসআলা: ইতিকাফকালে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই। নামায পড়া, তিলাওয়াত করা, ধর্র্মীয় গ্রন্থাদি পাঠ করাসহ অন্য যে কোন ইবাদত করা যাবে।
মাসআলা : যে মসজিদে ইতিকাফে বসা হয় তা জামে মসজিদ না হলে, জুমার দিন জুমার নামাযের জন্যে (অনুমান করে উক্ত মসজিদ থেকে) এতটুকো সময় নিয়ে বের হতে হবে, যাতে জুমা মসজিদে পৌঁছে সুন্নাত আদায় করে খুতবা শুনা যায়। জুমা মসজিদে কিছু সময় বেশি লেগে গেলেও ইতিকাফের কোনো ক্ষতি হবে না।
মাসআলা: প্রাকৃতিক অথবা শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত স্বল্প সময়ে জন্যে মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। চাই তা ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলক্রমে। এ অবস্থায় ইতিকাফ কাযা করা ওয়াজিব।
মাসআলা : রমযানের শেষ দশদিনের ইতিকাফ করতে হলে ২০ তারিখে সূর্যাস্তের পূর্বেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। এবং ঈদের চাঁদ দেখার পর মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে।
মাসআলা : ইতিকাফকারীর জন্যে জুমার দিন গোসল করা অথবা শুধু শীতলতা বা প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে গোসলের জন্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয নেই।
মাসআলা : এমনিভাবে জানাযার নামাযে শরীক হওয়া, অসুস্থ-রুগী দেখতে যাওয়া, পানাহার করা, নিদ্রা যাওয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে বের হলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
মাসআলা: ইতিকাফকারী ভুল করে যদি মসজিদ থেকে বের হয়ে যায়। তবুও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। ইতিকাফকারী যদি ভুল করে বিনা ওযরে মসজিদ থেকে অল্প সময়ের জন্যে বের হয়, অযথা ঘোরাফেরা না করলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
ইতিকাফ ভেঙে যাওয়ার কারণসমূহ—
১) বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া।
২) সহবাস করা।
৩) সহবাসের উদ্দেশ্যে স্পর্শ বা চুম্বন করা এবং এতে বীর্যপাত হওয়া।
৪) হস্তমৈথুন করা।
৫) স্ত্রীকে যৌন কামনায় স্পর্শ করা এবং এতে বীর্যপাত হওয়া।
৬) ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত করা।
৭) ইতিকাফ অবস্থায় হায়েয বা নিফাস শুরু হওয়া।
৮) জানাবাত অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা।
৯) মসজিদে অপবিত্রতা ছড়িয়ে দেওয়া।
১০) মসজিদ থেকে এমনভাবে বের হওয়া যাতে ইতিকাফের শর্ত ভঙ্গ হয়।
১১) শরয়ী প্রয়োজন ছাড়াই দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকা।
১২) ইতিকাফের নিয়ত ভেঙে দেওয়া।
১৩) ফরয গোসল ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে বের হওয়া।
১৪) ইতিকাফের স্থানে না থাকা।
১৫) ইতিকাফের সময় শেষ হওয়ার আগে ইচ্ছাকৃত বের হয়ে যাওয়া।
ডেস্ক রিপোর্ট