যুক্তরাষ্ট্র কোনো বড় সংকটে পড়লে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সত্যিই পাশে দাঁড়াবে কি না—এই প্রশ্ন তুলে ফের আলোচনায় এনেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, যা জোটের ভেতরে ও মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ন্যাটো সদস্যরা সেনা পাঠালেও তারা মূলত সম্মুখসারিতে না থেকে তুলনামূলকভাবে পেছনের অবস্থানে ছিল। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র কখনো বিপদে পড়লে ন্যাটো দেশগুলো একইভাবে পাশে দাঁড়াবে কি না—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ন্যাটোর জন্য এগিয়ে এসেছে, কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে জোটের প্রতিদান নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুচ্ছেদ ৫ সক্রিয় করা হয়। এই ধারায় বলা হয়েছে, জোটের কোনো এক সদস্যের ওপর আক্রমণকে সকল সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর পরবর্তী দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, ইতালিসহ একাধিক ন্যাটো দেশ অংশ নেয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মোট ৩ হাজার ৪৮৬ জন সেনা নিহত হন, যার মধ্যে ২ হাজার ৪৬১ জন ছিলেন মার্কিন সেনা। যুক্তরাজ্য ও কানাডার হতাহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
ট্রাম্পের মন্তব্যে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ত্যাগ ও অবদানকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সভাপতি এমিলি থর্নবেরি এই মন্তব্যকে আফগানিস্তানে প্রাণ হারানো ব্রিটিশ সেনাদের পরিবারের প্রতি ‘চরম অসম্মান’ হিসেবে আখ্যা দেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জন হিলি স্মরণ করিয়ে দেন, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ একবারই কার্যকর হয়েছে এবং তখন যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে যুক্তরাজ্যসহ মিত্ররা সরাসরি সাড়া দিয়েছিল।
দাভোসে ট্রাম্পের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক জবাব দেন ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে ইউরোপীয় মিত্ররা অবশ্যই পাশে দাঁড়াবে—যেমন তারা আফগানিস্তানে দাঁড়িয়েছিল। রুটে উল্লেখ করেন, আফগান যুদ্ধে প্রতি দুইজন মার্কিন সেনার বিপরীতে একজন করে অন্য ন্যাটো দেশের সেনা প্রাণ হারিয়েছেন, যা জোটের সম্মিলিত ত্যাগের প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, তার প্রেক্ষাপটেই ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন করে জোটের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন সামনে এনেছে।