রবিউল আউয়ালে বিভিন্ন এলাকায় মীলাদুন্নবী উপলক্ষে আনন্দ উৎসব, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে দেখা যায়, চাঁদা উত্তোলন করে মিষ্টি বিতরণ করা হয় এবং মসজিদগুলো বিশেষভাবে সাজানো হয়। হিন্দুদের বিয়ের অনুষ্ঠানের ন্যায় বিশেষ ধরনের ঝুল ও পাড় দিয়ে মসজিদে ছাউনী দেয়া হয়। এখন তো রাস্তাঘাটও বিশেষভাবে সাজিয়ে আলোর ব্যাপক অপচয় করা হয় এসব উৎসবে। এটাকেই কি মুহাব্বত বলা হয়? হ্যাঁ মুহাব্বত ঠিক আছে তবে তা তাদের কুপ্রবৃত্তির মুহাব্বত।
তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, তোমরাতো নিজেদের কুপ্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করেছো আর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ইসলামের অফুরন্ত ক্ষতি করেছ। ইসলাম বিরোধী যে ডামাডোল বাজছে, তা প্রতিহত করার জন্য ইসলামের পক্ষের শক্তিকে তুমি কতটুকু সাহায্য করতে পেরেছ? ইসলামের পক্ষে কী কাজ করেছ?
একদিকে ইসলামের জন্য কিছু নির্যাতিত বীরপুরুষ নিজেদের জীবনবাজি রেখে লড়ছেন, অন্যদিকে এসব বিদআতী মিষ্টি খাওয়ার পেছনে বিভোর হয়ে আছে। এদেরকে যদি কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তোমাদের এ অবস্থায় তাশরীফ আনেন আর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, মিষ্টি ক্রয় এবং মসজিদে আলোকসজ্জা করার জন্য যে চাঁদা আমরা উত্তোলন করেছি তা কি মিষ্টি ক্রয়ের জন্য ব্যয় করব? নাকি আপনার জানবাজ মুজাহিদ এবং মজলুম মুসলমানদের জন্য ব্যয় করব? তাহলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি এ জবাব দিবেন যে তোমরা মিষ্টি ক্রয়ের জন্য তা ব্যয় কর?
প্রিয় ভাইয়েরা! কোনো ব্যথিত ব্যক্তির জন্য এ অবস্থায় মিষ্টি খাওয়া শোভা পাবে কি? হায়! কোন মুখে এ অবস্থায় মিষ্টি খাওয়া আসে? কত মারাত্মক অনুভূতিহীনতা? কত বড় অন্যায়? আরো ক্রোধের কথা হচ্ছে এরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতের দাবী করে। ভাইয়েরা! তোমরা তো মীলাদুন্নবী উৎসব উদযাপন করেছ আর মুজাহিদগণ তাদের জীবনবাজি রেখে লড়াই করছেন, তাহলে কারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেমিক? চিন্তা করো ।
ঈদে মীলাদুন্নবীর আধুনিকায়ন এবং রাজনৈতিক রূপদান: পূর্বেকার লোকদের মাঝে ঈদে মীলদুন্নবী উদযাপনের পদ্ধতি ছিল এ উপলক্ষে পোশাক পরিবর্তন করা, বাড়ি ঘর সাজানো, বন্ধু বান্ধবকে একত্রিত করা, প্রথা হিসেবে যিকির আযকারের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং মিষ্টান্ন বণ্টন ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা। কিন্তু বর্তমানে লোকজন এটাকে রাজনৈতিক রূপদান করে এ উপলক্ষে সকলে সমবেত হয়ে কুরআন শরীফ তিলাওয়াতপূর্বক দু'আ করাকে আবশ্যক মনে করে।
উল্লেখ্য, মুসলমানদের কল্যাণ ও সফলতার জন্য দু'আ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম ইবাদত । কিন্তু দ্বীনের মধ্যে কোনো নতুন বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটানো কত মারাত্মক, তা তো আমাদের বুঝে আসে না। তদ্রূপ একই তারিখে দুআর জন্য এভাবে সমবেত হওয়া জায়েয হয় কীভাবে? অনেকে বলে থাকে এর মাঝে দ্বীনের মর্যাদা ও বীরত্ব নিহিত রয়েছে। একজন মৌলভী একবার আমাকে বললেন যে, তা'যিয়া থেকে বারণ করা উচিত নয়, কারণ এর মাধ্যমে বীরত্বের অনুশীলন ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। এমনিভাবে আরেক লোক বলে, শবে বরাতে আতশবাজি থেকে নিষেধ করা ঠিক নয়, কেননা এর মাধ্যমে বীরত্বের স্পিরিট সুসংহত হয়।
আল্লাহু আকবার! অনুভূতিহীনতা কত প্রকট আকার ধারণ করেছে। আর লোকদের বিবেক লোপ পেয়ে গেছে কীভাবে। এদের হাতেই যদি দ্বীনের সংযোজন বিয়োজন ক্ষমতা থাকত তবে আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন এরা দ্বীনকে কাটছাট করে কোথায় নিয়ে পৌঁছাত ।
প্রিয় ভাইয়েরা! তোমাদের উপর ফয়সালাকারী এবং পথ-প্রদর্শনকারী একটা শরীয়ত রয়েছে। অতএব এসব কুসংস্কার তোমরা অবশ্যই বর্জন করবে। তোমাদের খুশিমতো কোনো নিয়মনীতি বানিয়ে নেয়ার অধিকার তোমাদের কাউকে দেয়া হয়নি। তাই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য যে সকল বিধি-বিধান ও নিয়মনীতি দেয়া হয়েছে সেগুলোর ওপর আমল করার ব্যাপারে তোমরা আদিষ্ট। (তোমাদের অবশ্যই সেগুলো মেনে চলতে হবে।)
যদি কোনো বিদআতকে মুসলমানদের জন্য উপকারী জ্ঞান করেই আবিস্কার করে, তবে তা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়ের সংযোজন হওয়ার কারণে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। যারা বিদআতের মধ্যে উপকারিতা থাকার দাবি করে তাদের ব্যাপারে উক্ত জওয়াব প্রযোজ্য। প্রিয় ভাইয়েরা। বিদআতের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর কঠিন আপত্তি উত্থাপিত হয়। এভাবে যে, অমুক কাজটি উপকারী হওয়া স্বত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা দ্বীনের মধ্যে তা যুক্ত করেন নি। নাউযুবিল্লাহ। ঈদে মীলাদুন্নবীর ব্যাপারে বর্তমানে এ জাতীয় কথার ফুলঝুরি ছাড়া হয়, যা একেবারেই অবাস্তব, অসত্য ও অযৌক্তিক।
ঈদে মীলাদুন্নবীর আবিষ্কার: ঈদে মীলাদুন্নবীর আবিষ্কার এক মহাভুল। এটি আবিষ্কার করেন একজন মুসলিম বাদশাহ। –ইখতেলামে উম্মত আত্তর সিরাতে মুসতাকীম : ৭৮ খ্রিষ্টানদের মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই নাকি এর আবিষ্কার। খ্রিষ্টানরা যেভাবে বড়দিন উপলক্ষে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে উৎসব উদযাপন করে মুসলানরাও যেন ঈদে মীলাদুন্নবীতে উৎসব উদযাপন করতে পারে সে জন্যই এ প্রথার আবিষ্কার করা হয়। সতর্ক হওয়া উচিত। শুধু মিষ্টি বণ্টন করলেই কিংবা কিছু লোকের সমাগম হলেই কেবল অমুসলিমদের বিরোধিতা হয় না ।
সম্মানিত ভাইয়েরা! এসব ধার করা সৌন্দর্যের প্রয়োজন ইসলামের নেই। ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য তো সেটাই যা হযরত ওমর রাযি. সিরিয়ায় যাওয়ার পর সিরিয়াবাসী তাঁকে নতুন পোশাক পরার জন্য অনুরোধ করলে তিনি জবাবে বলেন, نحن قوم اعز نا الله با لا سلام আমরা ঐজাতি যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।
প্রিয় ভাই! আমরা যদি বাস্তবেই প্রকৃত মুসলমান হতে পারি তবে সকলের নিকটই আমাদের সম্মান থাকবে। সম্মান তো উপায় উপকরণ দিয়ে অর্জন করা যায় না, বরং উপকরণহীনভাবেই ইজ্জত চলে আসে । বিদআত এর পরিচয় হচ্ছে যে বিষয়টি কুরআন, হাদীস, ইজমা এবং কিয়াস তথা শরীয়তের এ চারটি মূল উৎসের কোনোটি দ্বারা প্রমাণিত না থাকে, তা যদি দ্বীন হিসেবে করা হয় তাই বিদআত।
এই মূলনীতি বুঝার পর এবার দেখুন! আমাদের যে সব ভাই ঈদে মীলাদুন্নবী নামে ১২ ই রবিউল আউয়াল উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে এবং ওরস ইত্যাদিতে লিপ্ত হয় এগুলোর কোনোটিই শরীয়তের মূল উৎস সমূহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। এগুলোকে দ্বীন মনে করে উদযাপন করা একেবারেই নিকৃষ্ট বিদআত এবং নিষিদ্ধ।
নব আবিষ্কৃত বিষয়াবলি দু'প্রকার: সুতরাং জেনে নেয়া চাই যে, ইসলামের সোনালী যুগ তথা খইরুল কুরূন এর পরবর্তী যুগে যে সব বিষয়/বস্তু আবিস্কার করা হয় তা দুই প্রকারঃ
প্রথম প্রকার হচ্ছে- যার আবিষ্কারের কারণ নতুন। অর্থাৎ খইরুল কুরূনে এর প্রয়োজন অনুভূত হয়নি; আর তার উপর কোন শরঈ বিধান সংশ্লিষ্ট থাকে অর্থাৎ এই বিষয়টি ছাড়া উক্ত শরঈ বিধানের ওপর আমল করা যায় না। যেমন- দ্বীনী কিতাবপত্র সংকলন, মাদরাসা এবং খানকাহ প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এগুলোর প্রয়োজন ছিল না, তাই এগুলোর আবিষ্কারের কারণও নতুন। আর এগুলো এমন প্রয়োজনীয় বিষয় যে, শরীয়তের বিধান এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে একথা সর্বজন বিদিত যে, দ্বীনের হেফাযত ও সংরক্ষণের দায়িত্ব সকলের। আর খইরুল কুরূনে ইসলামের হেফাযতের জন্য বর্তমানের ন্যায় এসব নতুন উপকরণ ও বিষয়ের প্রয়োজন ছিল না। তখনকার মানুষের স্মৃতিশক্তি এত প্রখর ছিল যে, কোনো কথা শোনা মাত্রই তা পাথরে খোদাই করার ন্যায় জমে বসে যেত, তাঁদের বুঝ শক্তি ছিল এত তীক্ষ্ণ যে, পাঠদান পদ্ধতিতে তাদেরকে বুঝানোর প্রয়োজন পড়ত না। দ্বীনদারী ও খোদাভীতি ছিল তাদের মাঝে অতুলনীয়। যুগের আবর্তনে পরবর্তীতে মানুষের মাঝে উদাসীনতা বেড়ে স্মৃতি শক্তি লোপ পেতে থাকে, অন্যদিকে প্রবৃত্তিবাদী এবং যুক্তির পূজারীদের সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়তে থাকে। মানুষের মাঝে দ্বীনদারীর মাত্রা অনাকাঙ্ক্ষিত হারে হ্রাস পেতে থাকে। ফলে উম্মতের ওলামায়ে কেরাম দ্বীনের অবলুপ্তি ও বিলীন হওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়েন।
এ অবস্থা দৃষ্টে তাঁরা দ্বীনের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও বিষয়ের প্রয়োজনীয় কিতাবাদি সংকলনের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাই দ্বীনী কিতাবগুলোর মধ্যে হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিকহ, উসূলে ফিকহ এবং আকাঈদের কিতাব সমূহ সংকলিত হয় এবং এগুলো পাঠদানের জন্য মাদরাসা সমূহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কারণ এগুলো ব্যতীত দ্বীনের সংরক্ষণের অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতি বাকি রয়নি।
এগুলোই হচ্ছে ঐ সব নব আবিষ্কৃত বিষয় যেগুলোর আবিষ্কারের কারণও নতুন যা খইরুল কুরূন তথা সাহাবী এবং তাবেঈগণের যুগে ছিল না, আর দ্বীনের হেফাযতও এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং এসব বিষয় বাহ্যত বিদআত মনে হলেও বাস্তবে এগুলো বিদআত নয়। বরং مقد مة الو اجب واجب ওয়াজিব সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উকরণও ওয়াজিব, এই মূলনীতি হিসেবে এটাও ওয়াজিব।
নব আবিস্কৃত বিষয়াবলির দ্বিতীয় প্রকার- দ্বিতীয় প্রকারের বস্তু সমূহ হচ্ছে যেগুলোর আবিষ্কারের কারণ প্রাচীন । অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এবং তাবেঈনদের যুগে যা বিদ্যমান ছিল। যেমন- প্রচলিত মিলাদের অনুষ্ঠানাবলি, মৃত্যু পরবর্তী তৃতীয়, দশম এবং চল্লিশতম দিবসে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে সংঘটিত অনুষ্ঠান উদযাপনের বিদআতসমূহ। এগুলোর কারণ এবং উপলক্ষ অনেক প্রাচীন। যেমন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠান উদযাপনের কারণ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জন্ম উপলক্ষে আনন্দিত হওয়া। আর এ কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেও ছিল। কিন্তু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা সাহাবায়ে কেরাম রাযি. এ উপলক্ষে কোনো অনুষ্ঠান উদযাপন করেননি । এখন প্রশ্ন উঠে যে, সাহাবায়ে কেরামগণ রাযি. কি এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেননি? নাউযুবিলাহ!
যদি এর কারণ বা উপলক্ষ তখন না থাকত তাহলে হয়ত এটা বলা যেত যে, এর উপলক্ষ ও কারণ তখন ছিল না। কিন্তু তখনও তো তা ছিল। তারপরও হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামগণ রাযি. মীলাদুন্নবী উপলক্ষে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেননি কেন?
অতএব এ জাতীয় নব আবিষ্কৃত বিষয়াবলির বিধান হচ্ছে এগুলো প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয় দৃষ্টি কোণ থেকেই বিদআত। সুন্নত এবং বিদআত চেনার এটিই মানদণ্ড ও মূলনীতি। এ থেকে শাখাগত বিরোধপূর্ণ সকল মাসআলার সমাধান বেরিয়ে আসে। উভয় প্রকারের বিদআতের মাঝে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। প্রথম প্রকারের অবিষ্কারক ও প্রতিষ্ঠাকারী হন বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম। সাধারণ লোক তাতে কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের অবিষ্কারক হয় সাধারণ লোকজন, তারাই এতে সব ধরনের হস্তক্ষেপ করে থাকে। আর মীলাদ এর অবিষ্কারক হচ্ছে আবু সাঈদ মুযাফফর নামক একজন বাদশাহ । –ইখতেলাফে উম্মত আত্তর সিরাতে মুসতাকীম : ৭৮ সে ছিল সাধারণ একজন মানুষ, আলেম নয়। বর্তমানেও সাধারণ লোকজনই এর প্রতি আগ্রহী এবং এ বিষয়ে সার্বিক হস্তক্ষেপ তাদের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।
ঈদ উৎসব উদযাপন একটি শরঈবিধানঃ ঈদ এমন উপলক্ষ ও সময়কে বলা হয়, যখন আমরা খুশী ও আনন্দ প্রকাশ করার ব্যাপারে আদিষ্ট। যেহেতু এটা দ্বীনী আনন্দ উৎসব তাই এর উদযাপনের দ্বীনি পদ্ধতিও জেনে নেয়া আবশ্যক। আনন্দ দু'ধরনের হয়ে থাকে। ১. দুনিয়াবী আনন্দ ২. দ্বীনী আনন্দ। সুতরাং দ্বীনী উৎসব উদযাপনের জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য ওহীর নির্দেশনা আবশ্যক। অর্থাৎ আমরা যদি দ্বীনি কোনো উৎসব উদযাপন করতে চাই তবে আমাদেরকে দেখতে হবে এক্ষেত্রে উৎসব উদযাপনের ব্যাপারে শরীয়ত আমাদেরকে অনুমোদন দেয় কি না? কেননা শরীয়ত বিরোধী কোনো পদ্ধতির আবিষ্কার বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। কারণ এটাতো হচ্ছে দ্বীনী বিষয়। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কারকে মূর্খ লোকজন দ্বীন হিসেবেই গহণ করবে, যা দ্বীনের মধ্যে মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
পক্ষান্তরে দুনিয়াবী খুশীর মধ্যে যেহেতু সে ধরনের কোনো ঝুঁকি নেই, তাই নিজের সুবিধা ও সুযোগ মতো উৎসব পালন করার অবকাশ আছে। যদিও উৎসব পালনের ক্ষেত্রেও শরঈ নীতিমালা মেনে চলা আবশ্যক।
বর্তমানে হিন্দুস্থানে ১২ই রবিউল আউয়াল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম দিন 'ঈদ' হিসেবে উদযাপনের প্রবণতা আমার ভাইদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে। (শুধু হিন্দুস্তানেই না আমাদের বাংলাদেশেও এ নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করতে দেখা যায়। অনেক দল ও সংগঠন এ দিবস উপলক্ষে র্যালী বের করে, নানা প্রকার ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে ঈদ হিসেবে এ দিবসকে উদযাপন করে। এটি একেবারেই প্রকাশ্য গোমরাহী। আল্লাহ পাক আমদেরকে হেফাযত করুন। আমীন! -অনুবাদক)
আর এ প্রবণতা অমুসলিমদের দেখানো পদ্ধতি যা ধর্মীয় গুরুদের সাথে তারা করে থাকে, তাদের থেকে মুসলমানগণ এসব কুপ্রথা ধার করে নিয়েছে। এ বিষয়ের বিধানও পূর্বোক্ত মূলনীতি থেকে জেনে নেয়া চাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম উপলক্ষে উৎসব করা একটি নিছক দুনিয়াবী উৎসব উদযাপন নয়; বরং এটি দ্বীনি উৎসব। অতএব এর পদ্ধতি নির্ধারনের জন্য ওহীর নির্দেশনা আবশ্যক।
শরীয়তে ঈদ দু'টি, তৃতীয় কোন ঈদ নেই: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে দু'টি ঈদ দান করেছেন। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা” অথচ অজ্ঞ লোকেরা আরেকটি ঈদ বাড়িয়ে নিয়েছে। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মীলাদ তথা জন্ম উপলক্ষে ১২ ই রবিউল আউয়ালকে ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করে, যা স্পষ্ট ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য ও আমলের সাথে সাংঘর্ষিক। এর একটি উদাহরণ এ রকম যে ইংরেজদের আইন অনুযায়ী সরকারী ছুটির তালিকা নির্ধারিত হওয়ার পর তা কম্পোজ এবং প্রেসে পাঠানো হয়। কম্পোজকারী কিংবা প্রেস ওয়ালা যদি এর সাথে ছুটির দিন হিসেবে আরো একটা দিন বাড়িয়ে দেয়, অর্থাৎ কালেক্টার সাহেবের নিয়োগের দিন অত্যন্ত আনন্দের বিষয় ও উপলক্ষ হওয়ায় সেদিনের ছুটিও ছুটির ঘোষণা পত্রে সংযোজন করে দেয় (কেননা কালেক্টর সাহেব বড় মাপের বিচারক)- উক্ত ব্যক্তির এ অন্যায় হস্তক্ষেপের বিষয়ে আইনজীবিদেরকে জিজ্ঞাসা করলে তারা কী বলবে? তারা অবশ্যই বলবে যে, এ লোকটি বড় অপরাধী। তাই এর বিরুদ্ধে কঠিন মামলা দায়ের হয়ে যাবে, আর যে কালেক্টর সাহেবের নিয়োগ উপলক্ষে ছুটির ঘোষণা দিয়েছে সেই কালেক্টর সাহেবই মামলা করে বসবে। কারণ খুশী ও উৎসব উদযাপন করা খারাপ বিষয় নয়। কিন্তু এর মাধ্যমে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনসাধারণের বে-আইনী ও অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়ে গেছে।
তদ্রূপ ১২ই রবিউল আউয়ালে ভালো খাবার পাকানো, কাপড় পরিবর্তন করা, উৎসব উদযাপন করা এই বিষয়গুলো যদিও মৌলিকভাবে ঘৃণিত নয়; কিন্তু এ উপলক্ষ্যে এসব কাজ করার দ্বারা দ্বীনের বিধানকে বিগড়িয়ে দেয়া হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল দু'টি ঈদ উৎসব উদযাপনের অনুমোদন দিয়েছেন- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। সুতরাং এর বাইরে তৃতীয় কোনো উপলক্ষকে ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করা শরীয়তের বিধান বিকৃতির নামান্তর।