মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা এবং ‘বোর্ড অফ পিস’-এর উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে (আইএসএফ) সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে মরক্কো। প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে উত্তর আফ্রিকার দেশটি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করল। গত ১৫ জুলাই রাজধানী রাবাতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইএসএফ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মরক্কোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের বৌরিতা এবং ‘বোর্ড অফ পিস’-এর মহাপরিচালক নিকোলে ম্লাদেনভের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ অধিনায়ক এবং আল-কুদস কমিটির সভাপতি; তার নির্দেশেই মূলত এই সামরিক অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমে গাজার রাফাহ শরণার্থী শিবিরে ৫০০ সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে ২০০ জওয়ানে নামিয়ে আনা হয়।
রাবাতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সামরিক মুখপাত্রদের দাবি, এই পদক্ষেপ মূলত একটি মানবিক মিশন এবং অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টারই অংশ। দেশটির ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতেই এই অবদান রাখা হচ্ছে। সরকারি খাতের সমর্থকরা গাজায় একটি ফিল্ড হাসপাতাল বা সামরিক হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনাকে প্রধান মানবিক সাফল্য হিসেবে সামনে তুলে ধরছেন।
কিন্তু মরক্কো সরকারের এই মানবিক আখ্যানকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে সেদেশের নাগরিক সমাজ এবং ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীরা। তাদের মতে, মরক্কোর এই পদক্ষেপের আড়ালে মূলত ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিকেই পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বয়কট আন্দোলন বিডিএস-এর প্রতিনিধি ও আন্দোলনকারীরা অভিযোগ তুলেছেন যে, এই কথিত হাসপাতাল স্থাপন একটি ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয় এবং রাবাত প্রকৃতপক্ষে গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ নিষ্ক্রিয় করা ও মার্কিন-ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় নামছে।
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ট্রাম্পের প্রস্তাবের আলোকেই তাদের নিরস্ত্রীকরণের শর্তসাপেক্ষ ঘোষণা দিলেও ইসরায়েল সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বদলে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ সেখানে নতুন করে অবৈধ বসতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে মরক্কোর মতো একটি আরব দেশের সেনা মোতায়েন ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে বলে আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
দেশের ভেতরেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মরক্কোবাসীদের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ অনুসারে, মরক্কোর সাধারণ মানুষের প্রায় ৮৯ শতাংশই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ মেনে নিতে রাজি নয়। তরুণ সমাজ এবং সাধারণ আন্দোলনকারীদের একাংশ এই ঘটনাকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে সংঘটিত গণহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজধানী রাবাতসহ বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্রীয় চাপ সত্তেও জনগণ বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোর রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনমতের মধ্যবর্তী ব্যবধান দিনে দিনে আরও স্পষ্ট ও চওড়া হচ্ছে। মরক্কো সরকার এই স্বাভাবিকীকরণকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডগত স্বার্থ অর্থাৎ পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন স্বীকৃতি পাওয়ার কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখে আসছিল। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েলি ভূখণ্ডগ্রাসী নীতির কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় দেশের ভেতরের সাধারণ মানুষ সরকারের এই কৌশলগত অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না।
মরক্কো ছাড়াও কসোভো, আলবেনিয়া, কাজাখস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ আইএসএফ বাহিনীতে যোগ দিতে সম্মত হলেও মিসরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের ভূমিকার পরিধি শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলস্বরূপ, একক আরব দেশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সেনা পাঠিয়ে মরক্কো এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও দেশের সাধারণ মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট