তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মতিন রচিত ১৭ খণ্ডের আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ প্রকাশ হয়েছে। দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণা, অধ্যবসায় ও পাঠদানের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত এ গ্রন্থকে হাদিস গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশ-বিদেশের আলেমরা।
বুধবার (০৫ আগস্ট) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিজি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক ইলমি সেমিনারে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের আলেম, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি বলেন, ইমাম তিরমিজির গ্রন্থে হাদিসের পাশাপাশি ফকিহদের মতপার্থক্য ও দলিলের বিশ্লেষণ স্থান পেয়েছে। তার ভাষায়, মাওলানা আব্দুল মতিন দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়ে একটি মানসম্পন্ন ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, গ্রন্থটি হাদিস পাঠদান ও দরসের পদ্ধতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তার মতে, এটি শুধু একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়, বরং হাদিস শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও হাদিস গবেষক মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, তিরমিজি শরিফের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে গেছে। ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি হাদিসের ধারাবাহিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে এবং সালাফের মানহাজ ও মতভিন্নতার শিষ্টাচার বজায় রেখেছে। তাঁর মতে, গ্রন্থটি হাদিস গবেষণার দীর্ঘদিনের একটি শূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখবে।
গ্রন্থকার মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, ২০০১ সালে মালিবাগ মাদরাসায় পাঠদানের প্রয়োজন থেকেই তার গবেষণার কাজ শুরু হয়। অর্থসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সংগ্রহ করতে না পেরে তিনি বিভিন্ন লাইব্রেরি থেকে বই এনে নোট প্রস্তুত করতেন। করোনাকালে কয়েক মাস ধারাবাহিকভাবে গবেষণার কাজ এগিয়ে নেন বলেও তিনি জানান।
জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার বলেন, একটি শব্দের সঠিক ব্যাখ্যা নির্ধারণের জন্যও লেখক শত শত মূল গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। ভবিষ্যতে তিরমিজি শরিফ নিয়ে গবেষণায় এ গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা জানান, গ্রন্থটির প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পর দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আরব বিশ্বের প্রকাশনার ধাঁচে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সেমিনারে সৌদি আরবের ড. শায়খ আব্দুল আজিজ আলহাজ, দক্ষিণ আফ্রিকার শায়খ ইসহাক বানা, সিলেটের মুহাদ্দিস মাওলানা শফিকুল হক সুরাইঘাটি এবং ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানীসহ দেশ-বিদেশের একাধিক আলেম গ্রন্থটির গবেষণাগত মান ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে গবেষণায় উৎসাহ দিতে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।
প্রকাশনা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’ বাংলাদেশি একজন আলেমের রচিত পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ। গ্রন্থটির সূচনায় বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা আলেমের মূল্যায়ন সংযোজিত হয়েছে এবং দীর্ঘ সম্পাদকীয় ও গবেষণা-নিরীক্ষার পর এটি আন্তর্জাতিক মানে প্রকাশ করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন আলেমের মতে, গ্রন্থটি হাদিসচর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণাধর্মী সংযোজন।
ডেস্ক রিপোর্ট