أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا، وَأَبْغَضُ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ أَسْوَاقُهَا. আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদ এবং সবচেয়ে অপছন্দের স্থান হলো বাজার। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৭১
‘মসজিদ আল্লাহর ঘর’– একথার পর সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকলেও আমাদের ওপর অপরিহার্য ছিল, মসজিদের পবিত্রতা ও আদব রক্ষা করা। কারণ এর আদব রক্ষা করা মহান আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। তথাপিও মসজিদের আদব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
যেসব বিষয়ে যত্নবান হলে মসজিদের আদব রক্ষা হয়, তন্মধ্যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে নিম্নে আলোকপাত করা হলো–
এক. ইখলাস ও তাকওয়ার ভিত্তিতে মসজিদ নির্মাণ করা
মুমিন বান্দা যেকোনো নেক আমল একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য করবে; এটাই ঈমানের দাবি, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কুরআন কারীম ও হাদীস শরীফে বিভিন্ন আঙ্গিকে এর প্রতি মুমিন বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন– সকল আমল নিয়ত অনুসারেই মূল্যায়িত হয়। আর প্রত্যেকে তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে। ফলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে (অর্থাৎ তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য) হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হয়েছে বলেই বিবেচিত হবে। আর যে হিজরত করে, পার্থিব কোনো বিষয় হাসিল করার জন্য কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার লক্ষ্যে, তার হিজরতের মধ্য দিয়ে সে কেবল তার উদ্দিষ্ট বিষয়ই হাসিল করতে পারবে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০৭
সুতরাং অন্যান্য আমলের মতো মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রেও ইখলাস ও তাকওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে ঘর বানাবেন। –সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৫০; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩১৮
অতএব মসজিদ নির্মাণ হতে হবে ইখলাস ও তাকওয়ার ভিত্তিতে; হিংসা-বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয়।
হিংসা-বিদ্বেষের ক্ষতি ও ভয়াবহতা বোঝার জন্য নবীজীর একটি হাদীসই যথেষ্ট। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিদ্বেষ হলো মুণ্ডনকারী। আমি বলি না, তা চুল মুণ্ডন করে; বরং তা দ্বীনকে সমূলে ধ্বংস করে। –মুসনাদে বায্যার, কাশফুল আসতার, হাদীস ২০০২
একটু ভেবে দেখি, আমাদের সমাজে কিছু মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে হিংসা-বিদ্বেষের ভিত্তিতে! এক মসজিদের পাশেই আরেক মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে কেবলমাত্র ঝগড়া ও পরস্পর বিদ্বেষ ও বিভক্তির ভিত্তিতে! আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।
দুই. মসজিদের পরিচালনা দ্বীনদার ব্যক্তির হাতে সোপর্দ করা
মসজিদ হলো দ্বীনের মারকায। এর পরিচালনা অত্যন্ত নাজুক। প্রতিটি পদক্ষেপেই প্রয়োজন ইলম ও তাকওয়ার। আর তাই মসজিদের সম্মান ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মসজিদ কমিটি নির্বাচন সম্পদ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে না করে তাকওয়া ও ইলমের ভিত্তিতে করতে হবে।
পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে আলেম, মুত্তাকী মুসল্লির হাতে অথবা ইমাম ও খতীবের হাতে। অগত্যা অন্য কারো হাতে যদি দিতেই হয়, তাহলে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হবে, যে নামাযী ও পরহেযগার। নিজের ঈমান-আমলের ব্যাপারে যত্নশীল। হালাল-হারামের বিষয়ে সচেতন। মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আলেম-উলামার পরামর্শক্রমে তা পরিচালনা করবে। মসজিদের খেদমতকে কর্তৃত্ব বা বাহাদুরি নয়; নিজের সৌভাগ্যের বিষয় মনে করবে।
লক্ষ করুন, মসজিদের খেদমত কারা করবে– এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন–
اِنَّمَا یَعْمُرُ مَسٰجِدَ اللهِ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَ الْیَوْمِ الْاٰخِرِ وَ اَقَامَ الصَّلٰوةَ وَ اٰتَی الزَّكٰوةَ وَ لَمْ یَخْشَ اِلَّا اللهَ فَعَسٰۤی اُولٰٓىِٕكَ اَنْ یَّكُوْنُوْا مِنَ الْمُهْتَدِیْنَ.
আল্লাহর মসজিদ তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান এনেছে এবং নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। এমন লোকদের সম্পর্কেই আশা আছে যে, তারা সঠিক পথ অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। –সূরা তাওবা (০৯) : ১৮
পরিতাপের বিষয় হলো, গুনাহ সয়লাবের দুটি কুপ্রভাব আমাদের অন্তরে পড়েছে :
ক. গুনাহের প্রতি ঘৃণা কমে গেছে।
খ.ইসলামের নিদর্শনাবলির প্রতি মর্যাদাবোধ কমে গেছে।
ফলে দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন, এমনকি প্রকাশ্য সুদ-ঘুষ ও অন্যান্য গর্হিত কাজে জড়িত লোকদের হাতেও মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছি– শুধু অর্থ ও ক্ষমতার কারণে। একটুও বিবেকে বাধছে না আমাদের!
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন!
তিন. মসজিদ নিয়ে অন্যের ওপর গর্ব না করা
কোনো কোনো সমাজে দেখা যায়, এক মহল্লায় মসজিদ নির্মাণ সুন্দর হলে পার্শ্ববতী মহল্লাবাসী আরও সুন্দর করে মসজিদ বানায়; যেন তাদের ওপর গর্ব করতে পারে। অথচ এতে তাদেরকে ছোট না করে বরং মসজিদেরই অবমাননা হলো। কেননা গর্ব করা ইসলামী শরীয়তে নিন্দিত কাজ। আর যদি গর্ব হয় মসজিদ নিয়ে, তবে তা আরও নিন্দনীয়, যাকে নবীজী কিয়ামতের আলামত আখ্যা দিয়েছেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– إن من أشراط الساعة أن يتباهي الناس في المساجد. নিশ্চয় কিয়ামতের আলামতসমূহের একটি এই যে, মানুষ মসজিদ নিয়ে একে অন্যের ওপর গর্ব করবে। –সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১৩২২
চার. ধীরেসুস্থে মসজিদে গমন ও নামাযে অংশগ্রহণ করা
নামাযে যেমন ধীরস্থিরতা অপরিহার্য, নামাযের দিকে আসার সময়ও তা কাম্য। এজন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন নামাযের ইকামত হয়, তোমরা নামাযের দিকে দৌড়ে যেয়ো না, বরং ধীরেসুস্থে হেঁটে যাও। অতঃপর যা পাও তা পড়, যা ছুটে যায় তা পূর্ণ কর। কারণ তোমাদের কেউ যখন নামাযের জন্য রওয়ানা হয়, সে নামাযে বলেই গণ্য হয়। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬০২
আরেক হাদীসে এসেছে, আবু কাতাদা রা. বলেন, একবার আমরা নবীজীর সাথে নামায পড়ছিলাম। নবীজী সামান্য আওয়াজ শুনলেন। নামাযের পর জিজ্ঞেস করলে কেউ কেউ বলল, আমরা নামাযের দিকে দ্রুত এসেছিলাম।
নবীজী বললেন, আর কখনো এমন করো না। নামাযের দিকে ধীরেসুস্থে আসবে। অতঃপর যা পাবে তা পড়বে আর যা ছুটবে তা পূরণ করে নেবে। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬০৩
একবার আবু বাকরা রা. নবীজীকে রুকুতে দেখে কাতারের পেছনেই নামায আরম্ভ করে রুকুতে চলে গেলেন। তারপর কাতারের দিকে হেঁটে এলেন।
নামাযের পর নবীজী তাকে বললেন, আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন। তবে আর কখনো এমন করো না। –সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬৮৪
পাঁচ . কোনো প্রকার দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু নিয়ে মসজিদে প্রবেশ না করা
হাদীস শরীফে আছে, নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এই দুর্গন্ধযুক্ত খাবার (অর্থাৎ পেঁয়াজ-রসুন) খাবে, সে যেন (তা থেকে মুক্ত না হয়ে) আমাদের মসজিদে না আসে। কেননা দুর্গন্ধের কারণে মানুষের মতো ফেরেশতাদেরও কষ্ট হয়। –সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৬৪
উল্লেখ্য, মুখের দুর্গন্ধের ন্যায় ঘামের কিংবা অন্য কোনো জিনিসের, যেকোনো ধরনের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করা আদবের খেলাফ। এ কারণেই জুমার দিন গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধির নির্দেশ এসেছে। (দ্র. সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৪৬-৮৪৭)