কোনো মানুষই চায় না— তার জীবনে ব্যর্থতা নেমে আসুক। চায় না— তাকে দুঃখ স্পর্শ করুক কিংবা স্পর্শ করুক হতাশা ও দুশ্চিন্তা। কিন্তু অমোঘ বাস্তবতা রুখবে কে? তাই সফলতার পাশাপাশি মানুষকে ব্যর্থতাও দেখতে হয়। সুখের সাথে মেনে নিতে হয় দুঃখকেও। না চাইলেও সয়ে যেতে হয় দুর্দশা ও দুশ্চিন্তা।
জীবনের এইসব ক্ষেত্রে মানুষ সবসময়ই যে নীতি-আদর্শে অবিচল থাকতে পারে— এমন নয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সে সরে যায় করণীয় থেকে। লিপ্ত হয়ে পড়ে নিষিদ্ধ কিংবা অনুচিত নানা কাজে। এক্ষেত্রে মানুষের স্বভাব দুর্বলতা তো আছেই। আরও আছে গাফলত ও অবহেলা, প্রবৃত্তি ও মন্দপ্রবণতা, আছে দৃঢ়তা ও অবিচলতার অভাব। উপরন্তু ইবলিস শয়তান তো আছেই। আছে তার ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা।
মানুষের এইসকল অবস্থা, স্বভাবজাত দুর্বলতা, অবহেলা, মন্দপ্রবণতা ও শয়তানের কুমন্ত্রণার কথা খুব ভালোভাবেই জানেন তিনি, যিনি সকলের খালিক ও স্রষ্টা এবং মালিক ও সর্বাধিকারী। তাই খুব সহজ ও সুন্দর প্রতিবিধানের ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি। দিয়েছেন উদ্ধারকারী সহজ মাধ্যম এবং প্রতিষেধমূলক সহজ প্রক্রিয়া।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন— وَ مَنْ يَّعْمَلْ سُوْٓءًا اَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهٗ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللهَ يَجِدِ اللهَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا. যে কেউ কোনো মন্দ কাজ করবে অথবা নিজের প্রতি জুলুম করবে, তারপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে— সে আল্লাহকে পাবে অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। —সূরা নিসা (৪) : ১১০
এখানে মন্দ কাজ তথা ছোট ছোট গুনাহ এবং নিজের প্রতি জুলুম তথা বড় ধরনের গুনাহ উভয়টির ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার কথা। বলা হয়েছে, ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহকে পাবে অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। অর্থাৎ বান্দা কোনো ভুল, অপরাধ বা সীমালঙ্ঘন করলেও তার প্রতি তিনি অত্যন্ত দয়ার আচরণ করেন। ক্ষমাগুণ প্রকাশ করেন। তাই দৃঢ় আশা করা যায় যে, তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন।
বাস্তবে সুস্থ বিবেকের অধিকারী কোনো মানুষই চায় না খারাপ হতে। চায় না মন্দ কাজ করতে কিংবা অপরাধী হতে। কিন্তু মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণে শিথিলতা এবং নফস ও শয়তানের প্রবঞ্চনা তাকে এসবে লিপ্ত করে ফেলে। তাছাড়া দুনিয়া যেহেতু পরীক্ষার জায়গা, এখানে ভালো ও মন্দ উভয় কাজের শক্তি দিয়ে মানুষকে পাঠানো হয়েছে। এরপর ভালো ও নেক কাজে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। মন্দ ও গুনাহের কাজে ঘোষণা করা হয়েছে শাস্তি। সেই শাস্তি থেকেই বাঁচার উপায় হলো তাওবা ও ইস্তিগফার।
অন্য একটি আয়াতে আরও উদার-ব্যপ্ত ঘোষণা এসেছে। এসেছে অভয় ও আশ্বাসবাণী। আল্লাহ তাআলা বলেন— قُلْ يٰعِبَادِيَ الَّذِيْنَ اَسْرَفُوْا عَلٰۤي اَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللهِ اِنَّ اللهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ. আপনি বলে দিন, হে আমার সেই বান্দারা! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। —সূরা যুমার (৩৯) : ৫৩
গুনাহ হয়ে গেছে! নিজের প্রতি অবিচার করেছ! সীমালঙ্ঘন করেছ! তবু নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু- এমন অভয় ও আশ্বাসবাণী পাওয়ার পর একজন মুমিনের হৃদয়ে কী আস্থা ও শক্তি অনুভূত হয় তা খুব সহজেই অনুমেয়।
তাওবার প্রতি উৎসাহ এবং ইস্তিগফারের ফায়েদা
শুধু তাই নয়। তাওবা ও ইস্তিগফারের প্রতি তিনি আলাদাভাবেও উৎসাহ দিয়েছেন। নির্দেশ করেছেন ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে। ইরশাদ হয়েছে— وَ سَارِعُوْۤا اِلٰي مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَ جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الْاَرْضُ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِيْنَ. এবং দ্রুত অগ্রসর হও তোমার রবের ক্ষমার দিকে এবং জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও যমীনের (প্রশস্ততার) ন্যায়। যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। —সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৩৩
অর্থাৎ যদি আল্লাহ তাআলার ক্ষমা লাভ করতে পার এবং যদি আল্লাহ তাআলার দয়া ও মেহেরবানী জুটে যায় তাহলে সেই জান্নাত পেতে পার, যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও যমীনের (প্রশস্ততার) ন্যায়। যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। মোটকথা, আল্লাহর ক্ষমা লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো তাওবা। আর সেটি তো মুত্তাকীদেরই পরিচয়-বৈশিষ্ট্য।
তাওবা-ইস্তিগফারের বিভিন্ন ফায়েদার কথাও উল্লিখিত হয়েছে কুরআন মাজীদে। যেমন হযরত নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় ইরশাদ হয়েছে— فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ اِنَّهٗ كَانَ غَفَّارًا،يُّرْسِلِ السَّمَآءَ عَلَيْكُمْ مِّدْرَارًا، َّ يُمْدِدْكُمْ بِاَمْوَالٍ وَّ بَنِيْنَ وَ يَجْعَلْ لَّكُمْ جَنّٰتٍ وَّ يَجْعَلْ لَّكُمْ اَنْهٰرًا. আমি বলেছি, তোমরা আপন রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি আকাশ থেকে তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। তোমাদেরকে ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন। তোমাদের জন্য সৃষ্টি করবেন উদ্যানরাজি আর তোমাদের জন্য প্রবাহিত করবেন নদ-নদী। —সূরা নূহ (৭১) : ১০-১২
অর্থাৎ ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনার ফলে এইসব বিষয় লাভ হবে। আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন। আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন এবং বাগ-বাগিচা ও নদ-নদীর ব্যবস্থা করে দেবেন। স্পষ্ট কথা যে, এগুলোর প্রত্যেকটিই এমন, যা ছাড়া মানুষের জীবন ও জগৎ প্রায় অচল। সেগুলোই খুব সহজে লাভ হতে পারে ইস্তিগফারের মাধ্যমে।
গুনাহের প্রভাব
উপরিউক্ত আয়াতসমূহে বর্ণিত বিষয়গুলো অবশ্যই মানুষকে আনন্দিত করে। হৃদয় ও মনে উদ্যম ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। ভাব ও ভাবনায় আশ্বাস ও সান্ত্বনার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ফলে যে কারও কল্পনায় বিষয়গুলো জাগরূক থাকলে গুনাহ হওয়া মাত্রই সে অবনত হবে। তাওবা ও ইস্তিগফার করবে। আল্লাহ তাআলাও তাঁর দয়া ও ক্ষমাগুণে তাকে মাফ করে দেবেন।
কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটি বিষয় আছে, যা খেয়াল রাখা খুব জরুরি। কুরআন মাজীদের বেশ কয়েকটি আয়াতে খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সে বিষয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ اَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيْقَهُمْ بَعْضَ الَّذِيْ عَمِلُوْا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ. মানুষ নিজ হাতে যা কামাই করেছে, তার কারণে জলে—স্থলে ছড়িয়ে পড়েছে বিপর্যয়, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কিছুটা শাস্তি আস্বাদন করান, যেন তারা (সৎপথে) ফিরে আসে। সূরা রূম (৩০) : ৪১
অর্থাৎ মানুষের জীবনে যেসব বিপদ ও মসিবত এবং দুর্যোগ ও দুর্দশা আসে সেগুলো তারই কৃতকর্মের ফল; গুনাহ ও পাপাচারের পরিণতি।
অন্য আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন— وَ لَنُذِيْقَنَّهُمْ مِّنَ الْعَذَابِ الْاَدْنٰي دُوْنَ الْعَذَابِ الْاَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ . আর আমি তাদেরকে (জাহান্নামের) সেই বড় শাস্তির আগে অবশ্যই লঘু শাস্তির স্বাদও গ্রহণ করাব। হয়তো তারা ফিরে আসবে। —সূরা সাজদা (৩২) : ২১ এখানে الْعَذَابِ الْاَدْنٰي (লঘু শাস্তি) বলে দুনিয়াবী শাস্তি তথা রোগ-শোক, আপন-বিপদ ও বালা-মসিবতকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ গুনাহের কারণে আখেরাতের শাস্তি তো আছেই; দুনিয়াতেও বিভিন্ন ধরনের বালা-মসিবতের মাধ্যমে সেই গুনাহের শাস্তি দেওয়া হবে। —দ্রষ্টব্য, তাফসীরে ইবনে কাসীর ৬/৩৬৯
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— وَ مَاۤ اَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِيْبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ اَيْدِيْكُمْ وَ يَعْفُوْا عَنْ كَثِيْرٍ . তোমাদের উপর যে মসিবত আসে, তা তোমাদেরই হাতের কর্মের ফলে। আর তিনি তোমাদের অনেক কিছুই (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন। —সূরা শূরা (৪২) : ৩০
বোঝা গেল, অনেক গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার পর আরও যা কিছু রয়ে যায় সেগুলোর কারণেও বিভিন্ন ধরনের বিপদ-মসিবত আসে। অর্থাৎ কৃত গুনাহ ও অপরাধের সবগুলোর জন্য বান্দা হয়তো তাওবা-ইস্তিগফার করেনি; অথবা করেছে, কিন্তু তার সব তাওবা কবুল হয়নি। এ বিষয়ে ‘তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন’ থেকে একটি টিকা তুলে ধরছি। হযরত শাইখুল ইসলাম দামাত বারাকাতুহুম লেখেন— দুনিয়ায় যে ব্যাপক বালা-মসিবত দেখা দেয়, যেমন- দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ভূমিকম্প, শত্রুর আগ্রাসন, জালিমের আধিপত্য ইত্যাদি, এসবের প্রকৃত কারণ ব্যাপকভাবে আল্লাহ তাআলার হুকুম অমান্য করা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। এভাবেই এসব বিপদাপদ মানুষের আপন হাতের কামাই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা মানুষের উপর এসব বিপদাপদ চাপান এজন্য, যাতে মানুষের মন কিছুটা নরম হয় এবং দুষ্কর্ম থেকে নিবৃত্ত হয়। প্রকাশ থাকে যে, দুনিয়ায় যেসব বিপদাপদ দেখা দেয়, অনেক সময় তার বাহ্যিক কারণও থাকে, যা প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী আপন কার্য প্রকাশ করে। কিন্তু এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেই কারণও আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি এবং বিশেষ সময় ও বিশেষ স্থানে তার সক্রিয় হওয়াটাও আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তিনি নিজের সে ইচ্ছা সাধারণত মানুষের পাপাচারের ফলেই কার্যকর করেন। এভাবে এ আয়াত শিক্ষা দিচ্ছে, সাধারণ বালা-মসিবতের সময় নিজেদের গুনাহের কথা স্মরণ করে আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা ও ইস্তিগফারে লিপ্ত হওয়া চাই, যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তা বাহ্যিক কোনো কারণঘটিত বিষয়। —তাওযীহুল কুরআন, সূরা রূম (৩০) : ৪১
উল্লিখিত একটি আয়াতে যেমন ছোট বড় গুনাহের প্রসঙ্গ এসেছে, অন্য একটি আয়াতে এসেছে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গুনাহের কথা। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَ ذَرُوْا ظَاهِرَ الْاِثْمِ وَ بَاطِنَهٗ اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْسِبُوْنَ الْاِثْمَ سَيُجْزَوْنَ بِمَا كَانُوْا يَقْتَرِفُوْنَ. তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ছেড়ে দাও। যারা গুনাহ করে, শীঘ্রই তাদেরকে তাদের কৃত গুনাহের কারণে শাস্তি দেওয়া হবে। —সূরা আনআম (৬) : ১২০
প্রকাশ্য গুনাহ হলো সেইসব গুনাহ, যা মানুষ তার বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা করে। যেমন- মিথ্যা বলা, গীবত করা, ধোঁকা দেওয়া ইত্যাদি। আর গোপন গুনাহ হলো সেইগুলো, যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন হিংসা, বিদ্বেষ, রিয়া, অহংকার ইত্যাদি। আয়াতে উভয় প্রকার গুনাহের শাস্তি শীঘ্রই দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি আয়াতে ভয়ানক সতর্কবার্তা উল্লিখিত হয়েছে। পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে তাদের কৃত অন্যায় ও অপরাধের কারণে যেভাবে পাকড়াও করা হয়েছে, তাদের বর্তমান উত্তরসূরিকেও সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সাথেও এমনটি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে— اَوَ لَمْ يَهْدِ لِلَّذِيْنَ يَرِثُوْنَ الْاَرْضَ مِنْۢ بَعْدِ اَهْلِهَاۤ اَنْ لَّوْ نَشَآءُ اَصَبْنٰهُمْ بِذُنُوْبِهِمْ وَ نَطْبَعُ عَلٰي قُلُوْبِهِمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ. যারা কোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের (ধ্বংসপ্রাপ্তির) পর তার উত্তরাধিকারী হয়, তাদের কি এই শিক্ষা লাভ হয়নি যে, আমি চাইলে তাদেরকেও তাদের গুনাহের কারণে পাকড়াও করতে পারি? এবং (হঠকারিতাবশত এ শিক্ষা গ্রহণ না করার কারণে) আমি তাদের অন্তরে মোহর করে দিতে পারি, ফলে তারা (কোনো কথা) শুনতে পাবে না? —সূরা আরাফ (৭) : ১০০
কোনো গুনাহ করার সময় কি মনে থাকে একথা? উপলব্ধির সাথে একথা মনে রাখতে পারলে বাস্তবেই গুনাহ করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। এখানে গুনাহের শাস্তির কথা তো আছেই, আরও আছে হঠকারিতাবশত এ শিক্ষা গ্রহণ না করার কারণে অন্তর মোহরাঙ্কিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সবাইকে এমন বিষয় থেকে রক্ষা করুন।
গুনাহের প্রভাব বিষয়ে একটি মূল্যবান কথা
উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের কাছে এ বিষয়ে আরও শিক্ষণীয় কয়েকটি কথা শুনেছি। হুযূর বলেন— ‘প্রত্যেকটি কাজের অন্তত দুটি দিক থাকে। একটি হলো কাজের বিধান। অর্থাৎ কাজটি ভালো কিংবা মন্দ, বৈধ কিংবা অবৈধ, পাপ কিংবা পুণ্য। আরেকটি হলো তার প্রভাব। অর্থাৎ কৃত কাজটির ভালো কিংবা মন্দ প্রভাব, শারীরিক, মানসিক কিংবা বস্তুগত বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যত ধরনের কাজকর্ম করে থাকি, প্রত্যেকটিরই বিধানগত দিক যেমন আছে, তেমনি আছে প্রভাবগত দিক। তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে গুনাহের বিধানগত দিক তথা পাপ ও অপরাধগত দিকটি ক্ষমা করে দেওয়ার কথা আছে। প্রভাবগত বিষয়টি দূর করে দেওয়ার ওয়াদা নেই। আল্লাহ তাআলা আপন কুদরতে, একান্ত দয়া ও মেহেরবানীতে তার প্রভাবও দূর করে দিতে পারেন। তবে সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা বা ওয়াদা দেননি।’
কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ বা নিয়মিত কোনো গুনাহ করে, এরপর তাওবা করে। তখন সেই তাওবা কবুল হলে হয়ত সে গুনাহ থেকে ক্ষমা পেয়ে যাবে। তবে গুনাহের প্রভাব ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে মুক্তি পাবে কি না— বলা যায় না। উপরন্তু হঠকারিতাবশত শিক্ষা গ্রহণ না করার কারণে অন্তরে মোহর এঁটে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সেজন্য আমাদের উচিত, সাধ্যের সবটুকু শক্তি ব্যয় করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। এরপরও কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করা এবং ইস্তিগফারের মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়ার আশায় গুনাহ করার মানসিকতা পরিত্যাগ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত : (মাসিক আল কাউসার ওয়েবসাইট থেকে, মাওলানা মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব)
ডেস্ক রিপোর্ট