হাঁস-মুরগি, গরু ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাংস, দুধ ও ডিমের চাহিদা পূরণে এসব প্রাণীর ভূমিকা অপরিসীম। তবে অধিক উৎপাদনের আশায় অনেক সময় খামারগুলোতে প্রাণীদের এমন খাদ্য খাওয়ানো হয়, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয় কিংবা নিরাপদ খাদ্যমান বজায় রাখে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীর খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, নিম্নমানের উপাদান বা অতিরিক্ত ওষুধ মেশানো হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও পৌঁছে যায়।
পশুপাখির খাদ্য সরাসরি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি গরু, ছাগল, হাঁস বা মুরগি যা খায়, তার প্রভাব মাংস, দুধ কিংবা ডিমের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে প্রাণীকে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা শুধু খামারের লাভজনকতার জন্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে অনেক সময় নিম্নমানের ও ভেজালযুক্ত পশুখাদ্য পাওয়া যায়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থও ব্যবহার করে থাকে। আবার কোথাও কোথাও পঁচা খাদ্য কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ পশুখাদ্যে মেশানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব খাদ্য দীর্ঘদিন খাওয়ানোর ফলে প্রাণীর শরীরে ক্ষতিকর উপাদান জমা হতে পারে।
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি। দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধের নামে অনেক খামারে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত খাদ্য ব্যবহার করা হয়। এর ফলে প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষ সেই মাংস, দুধ বা ডিম গ্রহণ করলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে।
নিরাপদ খাদ্য খাওয়ানো প্রাণী থেকে উৎপাদিত মাংসও নিরাপদ । অন্যদিকে অনিরাপদ ও নিম্নমানের খাদ্য প্রাণীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের গুণগত মানেও ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভোক্তারা।
গরুর খাদ্যে যদি ভারী ধাতু, রাসায়নিক বর্জ্য বা বিষাক্ত উপাদান থাকে, তাহলে তা পরবর্তীতে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। একইভাবে মুরগির খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান থাকলেও তা মাংসের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব উপাদান লিভার, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের প্রাণিসম্পদ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শিক্ষিত যুবকরাও এখন আধুনিক খামার গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন। তারা প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করছেন। এই নতুন প্রজন্মের খামারিদের নিরাপদ খাদ্য ব্যবহারের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। কারণ একটি খামারের সাফল্য শুধু উৎপাদনের পরিমাণে নয়, উৎপাদিত খাদ্যের নিরাপত্তার ওপরও নির্ভর করে।
খামারিদের অনুমোদিত ও মানসম্পন্ন খাদ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি, ভেজালবিরোধী অভিযান এবং খাদ্যের মান পরীক্ষা জোরদার করারও আহ্বান জানানো হয়েছে । নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে যেমন প্রাণী সুস্থ থাকবে, তেমনি মানুষও নিরাপদ মাংস, দুধ ও ডিম গ্রহণ করতে পারবে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খামার থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সতর্কতা প্রয়োজন। হাঁস-মুরগি ও গরুকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা শুধু একটি খামারের দায়িত্ব নয়; এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সুস্থ মানুষ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য প্রাণীর খাদ্যের মান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
ডেস্ক রিপোর্ট