শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের গুম ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেকাংশে হ্রাস পেলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকের প্রবণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হচ্ছে এবং নিয়মিতভাবে তাদের জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। আজ বুধবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ‘মব ভায়োলেন্স’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এইচআরডব্লিউর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।
সংস্থাটি আরও জানায়, বিগত সরকারের আমলের মতো এখনো মামলায় ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি করার সংস্কৃতি বজায় রয়েছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামক অভিযানে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক রাজনীতিক, আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীও রয়েছেন। গোপালগঞ্জের সংঘর্ষের পর ৮ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা এর একটি বড় উদাহরণ। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৪ জন হেফাজতে নির্যাতনের শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করেছে এইচআরডব্লিউ। মে মাসে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করার ফলে দলটির সভা-সমাবেশ ও অনলাইন প্রচারণায় বিধিনিষেধ রয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইন ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গুমের তদন্তে গঠিত কমিশন ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেলেও তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করার ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। সংস্থাটি মনে করে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।