তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়েছে। গাজা যুদ্ধ, সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং হর্ন অব আফ্রিকাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ক্রমেই মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে তুরস্ক-ইসরায়েল উত্তেজনা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে।
এরদোয়ান একাধিকবার ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে নাৎসি জার্মানির নেতা অ্যাডলফ হিটলারের তুলনা করেছেন। এমনকি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। এর জবাবে নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘ইহুদি-বিরোধী স্বৈরাচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময়ে তুরস্ককে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দুই দেশের বিরোধ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে সিরিয়াকে ঘিরে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন নতুন সিরীয় সরকারকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে আঙ্কারা। বিপরীতে, নিজেদের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে সিরিয়ার সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
সম্প্রতি উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনা দুই দেশের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ইসরায়েলের দাবি, তুর্কি বাহিনীর সম্ভাব্য মোতায়েন ঠেকাতেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে তুরস্ক ও সিরিয়া এমন কোনও সামরিক পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।
ঘটনাটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক। এর আগে ১৯ আগস্ট নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েল মেনে নেবে না। এর দুই দিন পর, ২১ আগস্ট তুরস্ক জানায়, ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে এরদোয়ান সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেবে।
গাজা যুদ্ধও তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন এরদোয়ান। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন এবং হামাসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
হর্ন অব আফ্রিকাতেও দুই দেশের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এরদোয়ান এই সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ ও গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক ও জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও তুরস্কের আপত্তি রয়েছে। এরদোয়ান ইসরায়েলের এমন কৌশলকে গুরুত্বহীন বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেও ইসরায়েলি প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা এখনই বেশি নয়। এর অন্যতম কারণ, যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে আঙ্কারা ও জেরুজালেমের মধ্যে যোগাযোগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে সিরিয়ায় দুই দেশের সামরিক তৎপরতা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ভুল হিসাব বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও সামরিক ঘটনা বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে—এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।