ঢাকা , শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬ , ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল) , ২১ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
দক্ষিণ এশিয়ায় ভয়াবহ খাদ্যসংকটের আশঙ্কা প্রকাশ এস জয়শঙ্করের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন জ্বালানি আজ দেশে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া দুই ঈদকে সরকারি ছুটির স্বীকৃতি ইরানকে ঘিরে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি মদিনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার অভিযোগ সৌদি জোটের,হুতিদের অস্বীকার পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপকূলে ভরা মৌসুমেও মিলছে না ইলিশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের ‘হ্যালো ডিসি’ চালুর পরিকল্পনা সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়: 'অল-ইনক্লুসিভ প্যাকেজ' চালুর ঘোষণা মিরপুরের ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনেভা ক্যাম্পের পিচ্চি রাজা: সোর্স থেকে মাদক কারবারের শীর্ষে এআই অসৎ লোকের হাতে পড়লে ১০০ কোটি মানুষের প্রাণ যেতে পারে: বিল গেটস জানুয়ারির অধিবেশনেই সংবিধান সংশোধন বিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাকৃবির ১০ তলা হলে লিফট নেই, না খেয়েই দিন কাটছে ছাত্রীদের র‌্যাবের পর এসআরবি, বদলেছে নাম ও আইনি কাঠামো তারেক রহমান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক জাতিসংঘে শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা গড়ার আহ্বান তারেক রহমানের সুপার এল নিনো কি, কিভাবে এটা আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে? গাজায় ট্রাম্পের শান্তি দাবি উড়িয়ে দিয়ে একে ‘লজ্জাজনক’ বললেন ম্যাক্রো তেল ও গ্যাস সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করতে রাজি আছে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

বোরোর পর এবার সবজিতে বড় ধাক্কা: কিশোরগঞ্জে ১২ কোটি টাকার ফসল নষ্ট, চরম সংকটে ৪ হাজার কৃষক

নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ২০-০৫-২০২৬ ০১:৫৩:৪৭ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২০-০৫-২০২৬ ০১:৫৩:৪৭ পূর্বাহ্ন
  • ৬ মিনিট পড়ার সময়
  • ৫২ বার পঠিত
বোরোর পর এবার সবজিতে বড় ধাক্কা: কিশোরগঞ্জে ১২ কোটি টাকার ফসল নষ্ট, চরম সংকটে ৪ হাজার কৃষক ছবি: সংগৃহীত
চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ক্ষতির ধাক্কা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি কিশোরগঞ্জের কৃষকেরা। এর মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জেলার সবজি খাত।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে সবজি খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯২৫ জন কৃষক।

জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকেরা বলছেন, চলতি মৌসুমে চালকুমড়া, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, করলা, ঢেঁড়স, বরবটি, মরিচ, ঝিঙে, লাউ, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কোথাও গাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও আবার অতিরিক্ত আর্দ্রতায় রোগবালাই ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় কৃষকেরা সময়মতো পরিচর্যাও করতে পারছেন না।

শুধু ফসলের ক্ষতিই নয়, এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে স্থানীয় বাজারেও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ইতোমধ্যে সবজির দাম বাড়তে শুরু করেছে। কয়েক দিন আগেও যে ঢেঁড়স প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলা, বরবটি, কাঁচা মরিচ, ঝিঙে ও লাউয়ের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। 

কৃষকেরা জানান, কয়েক মাস আগেই বোরো ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা আশার আলো হিসেবে সবজি চাষে ঝুঁকেছিলেন। ঋণ করে অনেকে জমিতে সবজি চাষ করেন। কিন্তু হঠাৎ করে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সেই স্বপ্নও ভেঙে পড়েছে। ফলে চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

মাঠ থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। 

জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে জমিতে কয়েক দিন ধরে পানি জমে থাকায় অধিকাংশ সবজি গাছের গোড়ায় পচন ধরেছে। কোথাও গাছের পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে গেছে। বিশেষ করে নিচু ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অনেক কৃষক সেচযন্ত্র দিয়ে পানি সরানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।

কৃষি অফিস বলছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট ৪ হাজার ৬৫২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির আবাদ হয়েছিল। কিন্তু অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় পুরো এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর মধ্যে ১৪১ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১৯ টন হিসেবে জেলায় মোট ২ হাজার ৬৮৭ টন শাকসবজির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি শাকসবজির গড় মূল্য ৪৫ টাকা ধরে কৃষি বিভাগ মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করেছে প্রায় ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা।

হোসেনপুরে ৮০ হেক্টর জমির শাকসবজি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। উপজেলাটিতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৮৫০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৫৩২ টন সবজি নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। 

একইভাবে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৮৫০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ২৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ৫৩২ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

পাকুন্দিয়া উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৪২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ২৩ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ৪৩৩ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

কটিয়াদী উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯৪ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৪১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ১১ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ২০৯ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

করিমগঞ্জ উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৩২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ১২ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ২২৮ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

তাড়াইল উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৬ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৪০০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ৩ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ৫৭ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

বাজিতপুর উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ২৮০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ১৫২ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

কুলিয়ারচর উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৪২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ২১ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ৩৯৯ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

ভৈরব উপজেলায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬৪ লাখ টাকা। এখানে প্রায় ৫০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখানে ৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ১৬৪ টন সবজি নষ্ট হয়েছে।

জেলা শহরের বাজারগুলো ঘুরে মঙ্গলবার দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া বেগুনের দাম ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ টাকা, করলা ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং চিচিঙ্গা ৬০ টাকা থেকে ৬৫ টাকা, কাঁকরোল ৭০ থেকে বেড়ে ১০০ টাকায় টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের কাশোরারচর গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন জানান, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে কাঁচা মরিচের আবাদ করেছিলেন। শুরুতে একবার মরিচ বিক্রি করতে পারলেও পরে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অনেক আশা নিয়ে চাষ করছিলাম। ভাবছিলাম এবার কিছু লাভ হলে সংসারটা একটু সামলাতে পারব। কিন্তু বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে।

একই গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া বলেন, প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে চাল কুমড়ার আবাদ করেছিলেন তিনি। গাছে মাত্র ফলন আসা শুরু হয়েছিল এবং বাজারে বিক্রির প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের টানা অতিবৃষ্টিতে জমিতে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এতে একের পর এক গাছ মরে যেতে থাকে।

তিনি বলেন, জমির দিকে তাকাতে পারি না। এত কষ্ট করে গাছ বড় করছি, কিন্তু কয়েক দিনের পানিতে সব শেষ। প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন এই কৃষক।

চরফরাদী এলাকার কৃষক লুৎফর মিয়া বলেন, প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তার পুরো সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনার দাবি জানিয়ে বলেন, সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে আগামী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুমড়া জাতীয় সবজি। বিশেষ করে নিচু এলাকাগুলোতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। জেলায় প্রায় ১৪২ হেক্টর সবজির জমি নষ্ট হয়েছে। সবজির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৯ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৪ হাজার কৃষক। কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রবি মৌসুমের আগেই সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে”।

তিনি বলেন, “বর্তমান আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তাই কৃষকদের জলাবদ্ধতা সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাতের সবজি চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগাম পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ের কৃষি সহায়তাও বাড়ানো হবে”।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।