ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ , ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাহরাইনে মার্কিন সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন হামলা: মানামাজুড়ে আতঙ্ক মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ২০০ শিশুর মৃত্যু ইরানে ১৩ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, নিহত ৩ চিকিৎসক: ডব্লিউএইচও মেট্রোরেলে ‘লুপ রাইডিং’ ঠেকাতে মতিঝিল স্টেশনে নতুন ব্যবস্থা ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হতে চান ট্রাম্প: খামেনির ছেলেকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলছেন স্থল অভিযানের জন্য আমরা ‘অপেক্ষা করছি’, মার্কিন হামলা হবে আত্মঘাতী: ইরান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের জরুরি ১২ নির্দেশনা: সরকারি অফিসে এসি ও আলোকসজ্জায় কড়াকড়ি ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডারকে হত্যার ইঙ্গিত ট্রাম্পের ইবি অধ্যাপিকাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা অন্তত ৩৩ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ট্রাম্পের ইরানে যুদ্ধক্ষমতা সীমিতের প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে খারিজ পরিত্যক্ত সরকারি ভবনগুলো হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনা ইরান সংঘাতে তেলের দাম এক লাফে বেড়েছে ১০% ইরানের হামলায় আমিরাতে এক বাংলাদেশি নিহত হামলা পাল্টা হামলা, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা ৭ দিনে বকেয়া বেতন ও ১২ মার্চের মধ্যে ঈদ বোনাস পরিশোধের নির্দেশ শ্রমমন্ত্রীর ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু; রেলপথে ১০ জোড়া বিশেষ ট্রেন ও বাড়তি নিরাপত্তা সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা; সুরক্ষায় ডেস্ট্রয়ার ‘এইচএমএস ড্রাগন’ পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্য: ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের গত ২৪ ঘণ্টার ২০টি প্রধান আপডেট হরমুজ প্রণালী বন্ধের পর গ্যাস ৩০% ঊর্ধ্বমুখী, তেলের দাম ১০০ ডলার ছোঁয়ার শঙ্কা

বাদশাহ ফয়সাল থেকে মোহাম্মদ বিন সালমান: সৌদি রাজতন্ত্রের সংস্কার বনাম আগ্রাসী রাজনীতি 

  • আপলোড সময় : ০৫-০৩-২০২৬ ১২:২৯:১১ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৫-০৩-২০২৬ ০১:০৯:১২ পূর্বাহ্ন
বাদশাহ ফয়সাল থেকে মোহাম্মদ বিন সালমান: সৌদি রাজতন্ত্রের সংস্কার বনাম আগ্রাসী রাজনীতি  ছবি: সংগৃহীত
ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সৌদি আরবের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও যুবরাজ "মোহাম্মদ বিন সালমান" যেখানে সামরিকভাবে পরাশক্তিধর দেশগুলোর সাথে আপোস করে চলেন, সেখানে তার চাচা "বাদশাহ ফয়সাল (ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ)" আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে চলতেন। বাদশাহ ফয়সালের শাসনামলে শক্তিধর দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে সামরিক আগ্রাসন চালালে তিনি সেটার জবাব দিতেন অত্যন্ত কড়া ভাষায়।

প্রয়োজনে বিশ্বের বড় বড় ও শক্তিশালী এবং সামরিকভাবে ক্ষমতাধর দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে প্রতিবাদের সৎ সাহস একমাত্র তিনিই দেখাতে পেরেছিলেন। এরফলে অনেকেই মনে করেন, ঠিক এই প্রতিবাদী মানসিকতার কারণেই তাকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল আততায়ীর হাতে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই দেশের উন্নয়নে বাদশাহ ফয়সালের অবদান অপরিসীম। তিনি সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা "আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ" এর তৃতীয় সন্তান, যিনি "আবদুল আজিজ আল সৌদ" নামেও অধিক পরিচিত।

আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ ও একত্রিত করতে সংগ্রাম করেছিলেন "আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ", যিনি (২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ – ৯ নভেম্বর ১৯৫৩) পর্যন্ত সৌদি আরবের বাদশাহ ছিলেন।

এরপর ক্ষমতায় আসেন "আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ" এর বড় ছেলে "সৌদ বিন আবদুল আজিজ", তিনি সৌদি আরবের শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (৯ নভেম্বর ১৯৫৩ – ২রা নভেম্বর ১৯৬৪) পর্যন্ত। বড় ভাইয়ের শাসনামলে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাদশাহ ফয়সাল। পরবর্তীতে (২রা নভেম্বর ১৯৬৪) তারিখে তিনি সৌদি আরবের বাদশাহ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

আয়তনে বিশালাকৃতির হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব তখনো মধ্যপ্রাচ্যের পিছিয়ে পড়া একটি দেশ হিসেবে গণ্য হতো, এরফলে ক্ষমতা গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিরাট এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। সেই চ্যালেঞ্জের সামাল দিতে ও দেশের আধুনিকায়নের জন্য সৌদি আরবের সদ্য আবিষ্কৃত হওয়া বিপুল পরিমাণ তেল সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেন।

বাদশাহ ফয়সাল অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগী হন তিনি। তার আমলেই ষাটের দশকে সৌদি আরবে প্রথম আধুনিক টেলিভিশন স্টেশন স্থাপন ও চালু করা হয়।

মেয়েদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা ও স্কুল চালুর উদ্যোগ নেন তিনি, সেসময় সৌদি আরবে বহুবিবাহের প্রচলন থাকলেও বাদশাহ ফয়সালের একসাথে একজনের বেশি সহধর্মিনী ছিলেন না। তার সহধর্মিনী ও রাণী "ইফফাত বিনতে মোহাম্মদ" মেয়েদের জন্য স্কুল শিক্ষা চালু করেন।

বাদশাহ ফয়সাল সৌদি আরবের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে এই বলে রাজি করাতে পেরেছিলেন যে, "শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের ভালো মা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে"। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল, সৌদি আরবের সদ্য আবিষ্কৃত হওয়া বিপুল পরিমাণ তেলসম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহারের নীতি।

এই নীতি চালুর ফলে নিজেদের দেশে আবিষ্কৃত হওয়া বিপুল পরিমাণ তেলসম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। এরফলে আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায় দেশটি। ১৯৭৩ সালে সংঘটিত চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে এই বিপুল পরিমাণ তেলসম্পদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি সরকার।

শত্রুপক্ষ কে সমর্থনকারী দেশগুলোতে তেলসম্পদ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়ে এক অভিনব আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় সৌদি আরব, এরফলে বিশ্বে রাতারাতি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। বাদশাহ ফয়সালের তেলসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী "শেখ ইয়ামানি" তখন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ইসরায়েল সমগ্র আরব এলাকা থেকে সব সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তেলের সরবরাহ বাড়ানো হবে না।

তার এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমা বিশ্বে অসম্ভব রকমের শোরগোল পড়ে যায়, ওই ঘটনার পর প্রভাবশালী টাইমস সাময়িকী ১৯৭৪ সালে বছরের আলোচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাদশাহ ফয়সালের নাম ঘোষণা করে। তার পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছিল পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর জনগণ।

বাদশাহ ফয়সাল শুধু আরব বিশ্বের নেতা হিসেবেই নন, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তার নেতৃত্বে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি সুসংগঠিত ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিক শক্তি শুধু উন্নয়নের জন্য নয়, ন্যায়সংগত অবস্থান রক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে। সেই দর্শন থেকেই তেলসম্পদকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭৩ সালের তেলসম্পদের মাধ্যমে অবরোধ ছিল তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতি এটি ছিল একটি কড়া ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা যে, মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থ উপেক্ষা করে একতরফা নীতি গ্রহণ করা যাবে না। এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি আরব বিশ্বের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

দেশের অভ্যন্তরেও তিনি প্রশাসনিক সংস্কার জোরদার করেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দেন। তার সময়েই বহু শিক্ষার্থীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হয়, যা পরবর্তীতে সৌদি আরবের দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, মসজিদ ও ইসলামী প্রতিষ্ঠানে সহায়তা সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় এবং সুসংহত করে।

১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ, তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যু শুধু সৌদি আরবেই নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। অনেকের মতে, তার দৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি ও আপোসহীন অবস্থানই তাকে বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।

আজও সৌদি আরবের আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে বাদশাহ ফয়সালের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, সঠিক নেতৃত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতা একটি দেশকে অল্প সময়েই বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে আসীন করতে পারে। তার জীবন ও কর্ম মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডিএমপিতে বড় রদবদল: কমিশনারের স্টাফ অফিসারসহ ৭ এডিসিকে বদলি

ডিএমপিতে বড় রদবদল: কমিশনারের স্টাফ অফিসারসহ ৭ এডিসিকে বদলি