ঢাকা , শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) , ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
সংবাদ শিরোনাম :
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নভেম্বরের মধ্যে রূপপুর থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে মক্কায় মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজ’ করার দায়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড মাদক, কিশোর গ্যাং ও র‍্যাগ ডে রোধে মাউশির নির্দেশ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে চুয়েটে ৩০ ঘণ্টা পর অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার, ক্যাম্পাসে না আসার শর্তে রেলখাতের উন্নয়নে ৮০টি নতুন ইঞ্জিন আমদানির উদ্যোগ: রেলমন্ত্রী কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আরও ৩৫৩ জন আটক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সুপারিশ তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রস্তাব ৪ বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্য বৈঠক শেষ আজ, আলোচনায় শুল্ক ও বাণিজ্য ঘাটতি রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া শুরু বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ এশিয়ার বাজারগুলোতে বাড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি অবসরভাতা পেতে শিক্ষকদের ভোগান্তি বন্ধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশকে খাদ্য নিরাপত্তায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার দেবে বিশ্বব্যাংক পাকিস্তান ও ভারতীয়দের তুলনায় বাংলাদেশিদের গড় আয়ু বেশি: WHO যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী কেন সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা? অক্টোবরে বেতনের সঙ্গে ৩ মাসের বকেয়া পেতে পারেন সরকারি চাকরিজীবীরা

কর আদায়ে ডিজিটাল নজরদারি বাড়াচ্ছে এনবিআর, বড় বাধা দক্ষ জনবলের ঘাটতি

আয়-সম্পদের তথ্য মিলিয়ে কর ফাঁকি শনাক্ত, ভ্যাট ও কাস্টমসে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা; বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও প্রশাসনিক সংস্কার

নিউজটি শুনুন
  • আপলোড সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০৩:০৯:৫১ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৭-১০-২০২৬ ০৩:০৯:৫১ অপরাহ্ন
  • ৫ মিনিট পড়ার সময়
  • ৯ বার পঠিত
কর আদায়ে ডিজিটাল নজরদারি বাড়াচ্ছে এনবিআর, বড় বাধা দক্ষ জনবলের ঘাটতি ছবি: সংগৃহীত

কর ফাঁকি শনাক্ত, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস ব্যবস্থায় তথ্য সমন্বয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অনলাইন কর নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরতের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দক্ষ জনবলের ঘাটতি, তথ্যের নির্ভুলতা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও করদাতাদের আস্থা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত পরিকল্পনায় রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করার বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে করদাতাদের আয়-সম্পদের তথ্য মিলিয়ে দেখা, সম্ভাব্য কর ফাঁকিদাতা শনাক্ত, বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানো।


২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশ আদায়ের দায়িত্ব সংস্থাটির ওপর।


এনবিআরের পরিকল্পনায় রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর পরিপালন ও প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে বলে পরিকল্পনায় জানানো হয়েছে। এ ধরনের লক্ষ্য অর্জনে শুধু করহার বাড়ানোর পরিবর্তে করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত এবং প্রকৃত আয় নিরূপণ জরুরি।


কর ফাঁকি শনাক্তে ব্যাংক লেনদেন, জমি ও ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ির মালিকানা, ক্রেডিট কার্ড, বিদেশ ভ্রমণ, সরকারি ক্রয়, শেয়ারবাজার ও ইউটিলিটি সংযোগসহ ১৬টি উৎসের তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে আয়কর রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে ঘোষিত আয় ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অসংগতি খোঁজা হবে।


এ জন্য ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যাক্সপেয়ার প্রোফাইল’ তৈরির মাধ্যমে করদাতার আয়, সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সমন্বিত চিত্র পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। টিআইএনধারীদের নিয়মিত রিটার্নদাতা, শূন্য রিটার্নদাতা, রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তি, নিষ্ক্রিয় করদাতা এবং সম্ভাব্য করদাতা—এমন কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করে কর পরিপালন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।


তবে ব্যাংকে অর্থ জমা, সম্পদ কেনা কিংবা বিদেশ ভ্রমণ কর ফাঁকির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট অর্থের বৈধ উৎস, কর পরিশোধের তথ্য ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনায় নিয়ে যাচাই করতে হবে। তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি করদাতাদের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।


রাজস্ব বাড়ানোর পথে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, কর অব্যাহতি, সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এনবিআরের উপস্থাপনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্কে কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির যথাক্রমে ২ দশমিক ৩৯, ৩ দশমিক ২৬ ও শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।


কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় সুবিধা কমানো হলে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিবেচনা না করে নির্বিচারে কর সুবিধা প্রত্যাহার করা ঠিক হবে না। কোন খাতে কী কারণে সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং তার বিনিময়ে কতটা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।


আয়কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে অনলাইনে নোটিশ পাঠানো, নথি জমা, শুনানি, মামলা বা কেস বরাদ্দ এবং আদেশ জারির ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। চাকরিজীবীদের জন্য আগে থেকে তথ্য পূরণ করা আয়কর রিটার্ন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ রিটার্ন এবং বকেয়া কর আদায়ে পৃথক ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে।


এ ছাড়া উৎসে করের হিসাব সংরক্ষণে রিয়েল-টাইম ট্যাক্স ক্রেডিট লেজার এবং অতিরিক্ত কর কর্তনের অর্থ ফেরত দিতে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে করদাতাদের সময় ও হয়রানি কমানো এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, আপিলের অধিকার ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


ভ্যাট ফাঁকি রোধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও লেনদেনের তথ্য সমন্বয়, ব্যবসায়ী শনাক্তকরণ নম্বরের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং কর অব্যাহতির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তামাক খাতে উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে নজরদারি, পণ্যের গতিপথ শনাক্তের ব্যবস্থা এবং স্ট্যাম্পে কিউআর কোড ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজে কর পরিশোধের ব্যবস্থা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবিড় তদারকির কথা বলা হয়েছে।


কাস্টমস ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির পণ্য চালানের তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ ঝুঁকির চালান শনাক্ত করা এবং যাচাই কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র একটি প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।


বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কাঁচামালের ব্যবহার ও মজুতের হিসাব তদারকি এবং বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য নিলামের মাধ্যমে জট কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। তবে এআইয়ের ঝুঁকি বিশ্লেষণ কেবল যাচাইয়ের নির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; কোনো চালানকে উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করলেই অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। এজন্য নিরপেক্ষ যাচাই, স্বচ্ছ শুল্কায়ন ও আপিলের সুযোগ থাকা জরুরি।


প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি জনবল সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনায় কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত জনবল কম থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। উপকমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘাটতি থাকলে কর নির্ধারণ, অডিট, বকেয়া আদায়, পণ্য যাচাই এবং বন্ড সুবিধার ব্যবহার তদারকিতে চাপ তৈরি হতে পারে।


এ অবস্থায় শুধু সফটওয়্যার চালু করাই যথেষ্ট নয়। দক্ষ জনবল নিয়োগ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার, করদাতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।


রাজস্ব বিশ্লেষকদের মতে, করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যাঁদের করযোগ্য আয় রয়েছে, তাঁদের প্রকৃত আয় ও সম্পদ নিরূপণ করে প্রাপ্য কর আদায় নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য ব্যাংক, ভূমি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য সমন্বয়, আধুনিক সফটওয়্যারের ব্যবহার এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।


সব মিলিয়ে এনবিআরের পরিকল্পনায় কর ফাঁকি শনাক্ত থেকে শুরু করে ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন পর্যন্ত একাধিক উদ্যোগ রয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, নির্ভুল তথ্য, ন্যায্য কর নির্ধারণ এবং করদাতাদের আস্থা অর্জনের ওপর। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও জোরদার হতে পারে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-১৮

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।