প্রযুক্তির বিবর্তন ও সাংবাদিকতার রূপান্তর
প্রিন্ট থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সাংবাদিকতার বর্তমান রূপ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
- আপলোড সময় : ১৬-১০-২০২৬ ১০:১৯:৪৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৬-১০-২০২৬ ১০:১৯:৪৭ অপরাহ্ন
- ৩ মিনিট পড়ার সময়
- ২২ বার পঠিত
ছবি: প্রতিনিধি
সাংবাদিকতার বিকাশ প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত। মুদ্রণযন্ত্র সংবাদপত্রের প্রসার ঘটিয়েছে, টেলিগ্রাফ সংবাদ প্রেরণের গতি বাড়িয়েছে, আর রেডিও ও টেলিভিশন সংবাদকে শব্দ ও দৃশ্যের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তবে ইন্টারনেটের আবির্ভাব সাংবাদিকতার কাঠামো, সংবাদ উৎপাদন ও গ্রহণের পদ্ধতিতে সবচেয়ে গভীর পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে সংবাদ নির্দিষ্ট সময়ের পত্রিকা বা বুলেটিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ২৪ ঘণ্টার একটি চলমান ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
প্রথাগত সাংবাদিকতায় সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রকাশ ও বিতরণের নিয়ন্ত্রণ মূলত সংবাদ প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল। পাঠক বা দর্শক ছিলেন প্রধানত সংবাদ গ্রহণকারী। ডিজিটাল সাংবাদিকতা এই একমুখী কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা যায় এবং পাঠকরাও মন্তব্য, শেয়ার, ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনে অংশ নিতে পারেন। ফলে সাংবাদিকতা এখন বহুমাধ্যমভিত্তিক ও আন্তঃক্রিয়াশীল একটি বিষয়।
সংবাদ গ্রহণের অভ্যাসের পরিবর্তন এই রূপান্তরের অন্যতম বড় দিক। Reuters Institute-এর Digital News Report 2025 অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে সামাজিক ভিডিওর মাধ্যমে সংবাদ গ্রহণের হার ২০২০ সালের ৫২ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে অনলাইন সংবাদ ভিডিও গ্রহণের হার ৬৭ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সংবাদপাঠ ধীরে ধীরে লেখা থেকে ভিডিও, অডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল ফরম্যাটের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। Pew Research Center-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত Facebook এবং ৩৫ শতাংশ YouTube থেকে সংবাদ গ্রহণ করেন; Instagram ও TikTok-এর ক্ষেত্রেও হার ২০ শতাংশ করে। এসব প্ল্যাটফর্ম সংবাদ বিতরণের পাশাপাশি কোন সংবাদ ব্যবহারকারীর সামনে আসবে, সেটিও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে প্রভাবিত করছে। ফলে সাংবাদিকতার প্রচলিত "গেটকিপার" কাঠামোর সাথে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমিক ভূমিকা যুক্ত হয়েছে।
ডিজিটাল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গতি ও বহুমাধ্যম ব্যবহার। একটি প্রতিবেদনে একই সাথে লেখা, ছবি, ভিডিও, অডিও, মানচিত্র ও তথ্যচিত্র যুক্ত করা যায়। ডিজিটাল সাংবাদিকতা সাংবাদিকদের বিপুল পরিমাণ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ দিয়েছে। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকেও ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। ফলে সাংবাদিকরা অনেক সময় প্রত্যক্ষদর্শীর সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন।
তবে এই দ্রুততা নতুন সমস্যাও তৈরি করেছে। যাচাই না করা তথ্য, গুজব, ভুয়া ছবি ও ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। Pew Research Center-এর গবেষণায় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ গ্রহণকারীদের মধ্যে ভুল তথ্য নিয়ে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ডিজিটাল সাংবাদিকতায় তথ্য যাচাই, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা এবং ছবি-ভিডিওর সত্যতা নির্ণয় আগের তুলনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সাংবাদিকতার এই রূপান্তরকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। তথ্য অনুসন্ধান, ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ, ডেটা বিশ্লেষণ, আর্কাইভ অনুসন্ধান ও সংবাদ উৎপাদনের বিভিন্ন সহায়ক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সাংবাদিকের বিকল্প হিসেবে দেখার পরিবর্তে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করাই অধিক যুক্তিসংগত। কারণ তথ্যের সামাজিক প্রেক্ষাপট, নৈতিক গুরুত্ব এবং জনস্বার্থ নির্ধারণে মানুষের বিচারবোধ এখনও অপরিহার্য।
বাংলাদেশেও সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক, ইউটিউব ও মোবাইলভিত্তিক সংবাদ গ্রহণ দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে সংবাদ প্রকাশের গতি বেড়েছে এবং নতুন ধরনের সাংবাদিকতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সাথে ক্লিকনির্ভর শিরোনাম, যাচাইহীন তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তির বিবর্তন তাই সাংবাদিকতাকে বিলুপ্ত করেনি, বরং তার চরিত্র পরিবর্তন করেছে। সংবাদ এখন দ্রুততর, বহুমাধ্যমভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও আন্তঃক্রিয়াশীল। ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ ও নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকতার পরিধি আরও বাড়াবে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি থাকবে সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট। প্রযুক্তি সংবাদ পরিবেশনের পদ্ধতি বদলাতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা কখনোই অ
প্রাসঙ্গিক হবে না।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।