রাশিয়ার ‘ম্যাক্স’ অ্যাপকে কেন্দ্র করে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও সরকারি নজরদারি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি ফরেনসিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইসের স্ক্রিন ও মিনি অ্যাপের তথ্য সংগ্রহ করতে এবং এসব অ্যাপে থাকা বার্তা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম। রাশিয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষকে অ্যাপটি ব্যবহারে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ম্যাক্স রাশিয়ার নিজস্ব একটি ‘সুপার অ্যাপ’, যেখানে বার্তা আদান প্রদান, আর্থিক সেবা এবং সরকারি বিভিন্ন সেবাসহ একাধিক কার্যক্রম একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপটি তৈরি করেছে দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ভিকোনতাকতে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রুশ সরকারের ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাপটিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পরোক্ষ মালিকানা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ ম্যাক্সকে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের দেশীয় বিকল্প হিসেবে প্রচার করেছে। দেশটির কয়েকজন পরিচিত তারকাও বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অ্যাপটির প্রচারণা চালিয়েছেন। এর ফলে চলতি গ্রীষ্মে ম্যাক্স রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মেসেজিং অ্যাপগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফির নেতৃত্বাধীন গবেষণায় অ্যাপটির নজরদারি সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা রাশিয়ায় ব্যবহৃত ম্যাক্সের একটি সংস্করণ বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, অ্যাপটি ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইসের স্ক্রিনশট নেওয়া এবং মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি সংগ্রহ করতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ম্যাক্স মিনি অ্যাপগুলোর মধ্যে সংরক্ষিত তথ্য, বার্তা ও আর্থিক লেনদেনের হিসাব ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে। এমনকি মিনি অ্যাপের মধ্যে ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগ থাকার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। এনসাফির মতে, এই সক্ষমতা থাকলে অ্যাপটিকে সাইবার হামলার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। তবে এসব সক্ষমতা বাস্তবে রুশ সরকার ব্যবহার করছে কি না, তা আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এনসাফি রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে ম্যাক্সকে ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাক্স সরাসরি ফোনে ইনস্টল থাকা টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করতে পারে না।
রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর ম্যাক্স ব্যবহারের চাপ তৈরির অভিযোগ রয়েছে। মস্কোর এক স্কুলশিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষক ও কর্মীদের সব ধরনের যোগাযোগ ম্যাক্সে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাজ পাঠানোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীও জানান, শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে তাঁকে ম্যাক্স ইনস্টল করতে হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন বা আবাসিক হলে প্রবেশের জন্য ম্যাক্সে তৈরি কিউআর কোড প্রয়োজন ছিল।
ম্যাক্স নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির একটি অংশ এখনো দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মতো অ্যাপ ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ম্যাক্সের ব্যবহার বাড়লেও ব্যক্তিগত যোগাযোগে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভিন্ন চিত্র রয়েছে।