২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ১৪৩ জন। শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৪৯৭টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ। এছাড়া ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা বা ২২ দশমিক ০৮ শতাংশ হয়েছে মুখোমুখি সংঘর্ষে এবং অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবেও পণ্যবাহী যানবাহন এগিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনায় পণ্যবাহী যানবাহন দায়ী, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনায় বা ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে। এছাড়া বাস ২ হাজার ১৬৪টি, থ্রি-হুইলার ৭৩২টি, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ ৪৩৮টি এবং পথচারী ২৯৬টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল।
সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে দুর্ঘটনা হয়েছে ৬ হাজার ৬৮৯টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি, শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এসব যানবাহনের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণরা ব্যবহার করেন। বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং দুর্বল নজরদারি দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত ও সহজলভ্য গণপরিবহনের সংকট এবং তীব্র যানজটের কারণে মোটরসাইকেলের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে।
প্রাণহানি কমানোর ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে বেপরোয়া চালনা, ট্রাফিক আইন অমান্য, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, সচেতনতার ঘাটতি, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবকে দায়ী করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে অতিরিক্ত গতিকে উৎসাহিত করার প্রবণতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংগঠনটি মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে Road Safety Campaign, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ধরন পরিবর্তন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়—তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও এতে প্রাণহানির হার কমানো সম্ভব হতে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট