কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় ইউরোপ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এ অবস্থান বদলাতে হলে দ্রুত নীতি ও বিনিয়োগে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ফিলিপ অ্যাগিয়ন। তার মতে, এআই একদিকে কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আনবে, অন্যদিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
২০২৫ সালে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গবেষণার জন্য পিটার হাউইট ও জোয়েল মোকিরের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অ্যাগিয়ন ব্রাসেলস ইকোনমিক ফোরামে ডিডব্লিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, এআই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায় সৃজনশীল ধ্বংস সৃষ্টি করবে, যেখানে কিছু চাকরি হারালেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের সময় যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও ইউরোপ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর ফল হিসেবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু জিডিপি ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই ধরনের পরিস্থিতি এআই খাতেও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন অ্যাগিয়ন।
বর্তমানে ওপেনএআই, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরি করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে এবং চীনও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ইউরোপের জন্য সরাসরি প্রতিযোগিতা কঠিন হলেও স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত খাতে এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ইউরোপের উন্নত স্বাস্থ্য ডেটা ও শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা নীতিমালা ভবিষ্যতে নৈতিক ও নিরাপদ এআই বিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এআই খাতে অগ্রসর হতে ইউরোপকে শিল্প ও উৎপাদন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে মত দেন এসএপির ভাইস চেয়ারম্যান টমাস সাউরেসিগ। তার মতে, ফিজিক্যাল এআই ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব। তবে এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা তহবিল, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং পেনশনভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন অ্যাগিয়ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের স্টার্টআপগুলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়ে, কারণ ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিতে অনাগ্রহী। এ কারণে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের আইনি কাঠামো, বিশেষ করে দেউলিয়া সংক্রান্ত আইন, বিনিয়োগবান্ধব করতে সমন্বয় প্রয়োজন।
এ ছাড়া ইউরোপের পরিবারগুলোর হাতে থাকা বিপুল সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ইউরো সঞ্চয়ের বড় অংশ রিয়েল এস্টেট ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে, যা স্টার্টআপ খাতে কম প্রবাহিত হচ্ছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে গতি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ডারপার আদলে একটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন অ্যাগিয়ন। তার মতে, শুরুতে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে, পরে অন্য দেশগুলো যুক্ত হতে পারবে।
এআইয়ের সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। বিশেষ করে যেসব মানুষ চাকরি হারাতে পারেন, তাদের পুনঃপ্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সামাজিক অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট