জীবনের দীর্ঘ সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর টেকনিশিয়ান হিসেবে কাটানো ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ দাউদ আলী এক অদ্ভুত লড়াইয়ের মুখোমুখি। যে রাষ্ট্রকে তিনি নিজের শ্রম আর আনুগত্য দিয়ে সেবা করেছেন, সেই রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন হঠাৎ তাকে এবং তার সন্তানদের ভোটার তালিকা থেকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। অথচ তার কাছে পাসপোর্ট আছে, আছে সামরিক পরিষেবার বৈধ নথিপত্র। স্ত্রী ভোটার হিসেবে বহাল থাকলেও দাউদ আলীর ভবিষ্যৎ আজ আর তার নিজের হাতে নেই; বরং তা নির্ধারিত হচ্ছে বহু দূরের কোনো ডেটা সেন্টারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ নামক এক অদৃশ্য বিচারক ঠিক করে দিচ্ছে—কে নাগরিক আর কে নয়।
দাউদ আলীর এই অসহায়ত্ব ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেরই এক প্রতীকী চিত্র মাত্র। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ‘গণতান্ত্রিক’ দেশটিতে ভোটাররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেবেন—এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এক বিপরীতমুখী সত্যকে সামনে নিয়ে আসছে। দেশটির জনগণ আজ এমন এক নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রার্থীরাই সুকৌশলে আগেভাগে ঠিক করে নিচ্ছেন কারা ভোটার হিসেবে গণ্য হবেন।
দাউদ আলীর এই অসহায়ত্ব ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেরই এক প্রতীকী চিত্র মাত্র। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ‘গণতান্ত্রিক’ দেশটিতে ভোটাররা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নেবেন—এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এক বিপরীতমুখী সত্যকে সামনে নিয়ে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একসময় তৃণমূল ও বিজেপির এই চরম মেরুকরণের বাইরেও বামফ্রন্টের শক্তিশালী সাংগঠনিক অস্তিত্ব ছিল, যারা ভোটার তালিকায় নাম তোলা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ভূমিকা পালন করত। বামফ্রন্ট আমলের সেই পাড়াভিত্তিক নজরদারি আজ অনুপস্থিত, যার সুযোগ নিয়ে ডিজিটাল কারসাজি আরও সহজ হয়ে উঠেছে কি না, সেই প্রশ্নও আজ প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে শাসক তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপির লড়াইয়ের মাঝে লাখ লাখ মানুষের নাগরিক অধিকার আজ অনিশ্চিত গন্তব্যে দাঁড়িয়ে।
গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা দখলের কৌশল কেবল নির্বাচনি প্রচার বা দল ভাঙানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এক বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পথে হাঁটছে, যেখানে নির্বাচনের আগেই জনবিন্যাস বা ভোটার-মানচিত্র পুনর্গঠন করা হচ্ছে। আসামে তারা ‘ডিলিমিটেশন’ বা আসন বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম-প্রধান আসন সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ২০-এ নামিয়ে এনেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তারা আসন না বদলে ‘এসআইআর’ বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনকে হাতিয়ার করেছে, যাতে ভোটারদের নাম সরাসরি তালিকা থেকেই মুছে দেওয়া যায়। এটি আসলে আসাম মডেলের এক উন্নত ও ভয়ংকর সংস্করণ।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে নির্বাচনের আগে ভোটারদের নিজেদের সুবিধামতো ‘এডিট’ করার এক রাজনৈতিক নকশা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কেন্দ্র ও বিজেপি আসলে পশ্চিমবঙ্গের ইলেক্টোরেটকে নিজেদের সুবিধামতো নকশা করছে। যার ফলে নির্বাচনে ভোটাররা আর প্রার্থী বেছে নিতে পারছে না; বরং প্রার্থীরাই ভোটার বেছে নিচ্ছে। প্রশ্ন থেকে যায়—পশ্চিমবঙ্গের এই এসআইআর প্রক্রিয়াটি কি শুধুই কারিগরি সংশোধন, নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ‘ইলেক্টোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং’?
প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ যখন রাতারাতি নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়েন, তখন গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে যখন দেখা যায়, বাদ পড়া বা ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা মানুষের একটি বিশাল অংশ নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মুর্শিদাবাদ, মালদহ কিংবা উত্তর ২৪ পরগনার মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে গণহারে নাম কাটা পড়ার ঘটনা কেবল কাকতালীয় হতে পারে না।
এখানে এসআইআরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভোটাররা প্রার্থী বেছে নেওয়ার অধিকার হারানোর আগেই তাদের নাগরিক পরিচয় নিয়ে লড়তে বাধ্য হচ্ছেন। প্রকৃত অর্থেই নির্বাচনের মৌলিক চরিত্র বদলে গেছে; এখন প্রার্থীরাই ভোটার বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই প্রকল্পের সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত বৈষম্যের চেহারাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উদাহরণটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই আসনে গতবার ক্ষমতাসীন দলটি অতি সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল। এখানে দেখা যাচ্ছে, এসআইআরের ফলে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৯৫.৫ শতাংশই মুসলিম; অথচ এই এলাকায় এই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা মাত্র ২৫ শতাংশ।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ভবানীপুর থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন আসনে। নির্দিষ্ট এক ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত ভোটব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করে এই যে ‘যুক্তিপূর্ণ অসংগতি’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’র দোহাই দেওয়া হচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনের আগে থেকেই ফলাফলকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসা। এটিই সেই বাস্তবতা, যেখানে ভোটারদের প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে প্রার্থীরাই ভোটার বেছে নেওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নাম বা বানানের তুচ্ছ ভুলগুলোকে যেভাবে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা আসলে ক্ষমতার এক নগ্ন আস্ফালন। এই প্রক্রিয়ায় ভোটাররা আর প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, কারণ প্রার্থীদের নির্বাচনি ক্যালকুলেটর আগেই স্থির করে ফেলেছে—কাদের ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেন্দ্র সরকার, বিশেষ করে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার অবকাশ রয়েছে। কমিশন বারবার ‘পবিত্র ভোটার তালিকা’র কথা বললেও বাস্তবে তারা এমন এক যান্ত্রিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছে যা সাধারণ মানুষের অধিকারকে খাটো করে দেখে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের ক্ষেত্রে এই এসআইআর প্রক্রিয়া এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের পর পদবি বদল বা পৈতৃক ভিটার নথিপত্র জোগাড় করতে না পারার কারণে লাখ লাখ নারী আজ তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
এই সংকটের একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা রয়েছে যা উপেক্ষা করার মতো নয়। পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটার ছাঁটাই কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য এক বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ‘কাগজে-কলমে অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই মানুষদের উদ্বাস্তু করার একটি সূক্ষ্ম বর্ণবাদী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। যখন রাষ্ট্র নাগরিককে কেবল ক্ষমতার চোখে ‘যাচাইযোগ্য এবং ছাঁটাইযোগ্য ডেটা’ মনে করে, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
কেন্দ্র ও বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক যন্ত্র যেভাবে সুকৌশলে ভোটার তালিকাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে পুনর্লিখন করছে, তা ভবিষ্যতে অবাধ ও ন্যায্য নির্বাচনের ধারণাকেই নস্যাৎ করে দিতে পারে। জনমতের চেয়েও যখন পরিসংখ্যানগত কারসাজি বড় হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের এই উলটপুরাণ আসলে একটি বড় বিপদের সংকেত। আদালতের অবস্থানও এই সংকটে সাধারণ মানুষকে খুব একটা স্বস্তি দিতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্ট যখন জানায় যে নির্বাচনের আগে এই লাখ লাখ ‘বিবেচনাধীন’ মামলার নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়, তখন প্রকৃতপক্ষে লাখ লাখ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার স্থগিত হয়ে যায়।
ট্রাইব্যুনালের গোলকধাঁধায় পড়ে সাধারণ মানুষ যখন নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তখন ক্ষমতার বেনিয়ারা নির্বাচনের মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। এটি কেবল পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র ভারতীয় গণতান্ত্রিক চরিত্রের ভয়ংকর বিবর্তন। ভোটাধিকার শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি একজন মানুষের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। যখন সেই অধিকার প্রার্থীদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে কাটছাঁট করা হয়, তখন নির্বাচন কেবল একটি প্রহসনে পরিণত হয়।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের এই পরিস্থিতি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের জন্যও এক সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে। ভোটারদের সরিয়ে দিয়ে বা বদলে দিয়ে বিজেপির নির্বাচন জেতার এই যে নতুন কৌশল, তা আসলে সার্বভৌম জনগণের ক্ষমতাকে কেড়ে নেওয়ারই নামান্তর। বিজেপি জয়ের দাবি করলেও ভোটার তালিকার এই কেলেঙ্কারি শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বুমেরাং হতে পারে। কারণ কেবল তৃণমূলের ভোটব্যাংক নয়, বরং মতুয়া হিন্দু আর হিন্দু ধর্মাবলম্বী রাজবংশী আদিবাসীদের নামও ব্যাপকভাবে কাটা গেছে। সিএএ সত্ত্বেও নাগরিকত্বের আশায় বসে থাকা এই প্রান্তিক মানুষগুলো যখন দেখেন তাদের নামই তালিকা থেকে গায়েব, তখন হিন্দু শিবিরের অভ্যন্তরেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘ভোটের মাধ্যমে প্রতিশোধ’ নেওয়ার ডাক দিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষকে আরও সংঘবদ্ধ করতে পারে।
তবে রাজনীতির হার-জিতের ঊর্ধ্বে বড় প্রশ্নটি হলো নৈতিকতার। যদি এক বিশাল সংখ্যক মানুষকে প্রশাসনিক সফটওয়্যারের ভুল বা রাজনৈতিক নকশার কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে সেই নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে যায়।
ভোটাররা প্রার্থীকে নয়, প্রার্থীই ভোটার বেছে নিচ্ছে—এই রূঢ় সত্যটি যদি সমাজ ও রাষ্ট্র অনুধাবন না করে, তবে আগামী দিনে ভারতীয় গণতন্ত্র কেবল একটি খোলস হিসেবে বেঁচে থাকবে, যার ভেতরে মানুষের কোনো সত্যিকারের অধিকার থাকবে না। নাগরিক যখন কেবল ক্ষমতার তথ্যে পরিণত হয়, তখন মুক্তির সব পথই একে একে বন্ধ হয়ে যায়। দাউদ আলীর মতো মানুষদের যন্ত্রণার জবাব বিশাল ভারতকে দিতেই হবে, নচেৎ ইতিহাসের আদালতে একদিন গণতন্ত্রের এই বিপর্যয়কে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
এবার পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হচ্ছে। প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোসহ মোট ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে কলকাতা, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ও নদীয়াসহ মোট ১৪২টি আসনে। ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২
ভোটার তালিকা থেকে বাদ ৯১ লাখ নাম: পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে এআই ও ‘এসআইআর’ বিতর্ক
- আপলোড সময় : ২২-০৪-২০২৬ ১২:৫৭:৫৪ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৪-২০২৬ ০১:৩২:৪৩ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট