চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার একটি দেশ কীভাবে আধুনিক যুদ্ধের নিয়ম পাল্টে দিল — ইরানের ড্রোন কর্মসূচির ইতিহাস মূলত সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ ওয়ার্কশপে কয়েকজন তরুণ প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীর হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংঘাতে নির্ধারক ভূমিকা রাখছে।
১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দেশটির সামরিক সক্ষমতা রাতারাতি ভেঙে পড়ে। শাহের আমলে কেনা এফ-১৪ টমক্যাটসহ শত শত কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান অকেজো হয়ে পড়ে, কারণ সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতেন আমেরিকান প্রকৌশলীরাই। তারা দেশ ছেড়ে চলে যান, যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮০ সালে ইরাক আগ্রাসন শুরু করলে ইরান প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেই যুদ্ধে প্রায় দশ লাখ মানুষের প্রাণ যায়।
এই সংকটই ইরানকে বাধ্য করে ভিন্ন পথে হাঁটতে। প্রশ্নটা ছিল সহজ — যদি সীমান্ত পেরিয়ে গোয়েন্দা বিমান পাঠানো না যায়, তাহলে ছোট ও রিমোট-নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না কেন? ১৯৮১ সাল থেকেই ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীরা সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ শুরু করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন একজন বেসামরিক পাইলট, একজন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র এবং একজন পেশাদার স্বর্ণকার। প্রথম মডেলটিতে জ্বালানি ট্যাঙ্ক হিসেবে মেডিকেল আইভি ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছিল, পাখাটি ছিল হাতে তৈরি। সামরিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সেটি দেখে উপহাস করেছিলেন।
তবু ১৯৮৩ সালে সেই 'খেলনা বিমান' প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে ইরাকি সামরিক অবস্থানের স্পষ্ট ছবি তুলে আনে। এরপরই 'থান্ডার ব্যাটালিয়ন' গঠন করে আনুষ্ঠানিক ড্রোন কর্মসূচি শুরু হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে শুধু নজরদারি নয়, আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবেও ড্রোন তৈরির কাজ এগিয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে ইরান পরিণত হয় বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটিতে, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে সশস্ত্র পাইলটবিহীন আকাশযান ব্যবহার করেছে।
ইরানি কৌশলের কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ অর্থনৈতিক হিসাব। একটি ড্রোন তৈরিতে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হলে ১০০টি ড্রোন পাঠাতে লাগে ২০ লাখ ডলার। অথচ সেগুলো ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে ব্যয় করতে হয় ২০ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় হামলায় এই কৌশলের কার্যকারিতা বিশ্বের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় — মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলারের ড্রোন দিয়ে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করা সম্ভব হয়, এবং অত্যাধুনিক মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সেগুলো ঠেকাতে পারেনি।
২০২২ সালে ইউক্রেনের আকাশে ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের উপস্থিতি বিশ্বকে নতুনভাবে চমকে দেয়। নিষেধাজ্ঞার চাপে জন্ম নেওয়া একটি কর্মসূচি যে বৈশ্বিক সামরিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে, সেটি আজ আর কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
ডেস্ক রিপোর্ট