ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনাকারী ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতার হাত ধরে বিলাসপণ্যের ব্র্যান্ড হিসেবে পুনরায় যাত্রা শুরু করা কোম্পানিটি মাত্র ১৫ বছরের মাথায় দেউলিয়া হয়ে অবসায়ন প্রক্রিয়ায় গেছে বলে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ব্রিটেনের সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে অবসায়ন কার্যক্রম শুরুর জন্য লিকুইডেটর নিয়োগ করা হয়। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল গ্রুপের কাছে কোম্পানিটির দেনা ছয় লাখ পাউন্ডের বেশি জমে। পাশাপাশি কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মীদের পাওনা হিসেবে ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ডের দায় ছিল। লন্ডনের মেফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে তাদের দোকানটি বর্তমানে খালি এবং ভাড়া দেওয়ার নোটিশ ঝুলছে। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটও অচল রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর, ইংল্যান্ডের রানি রানি প্রথম এলিজাবেথ-এর রাজকীয় সনদের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল একটি জয়েন্ট স্টক ট্রেডিং কোম্পানি, যার উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিজ নামে পরিচিত ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য। ১৬১২-১৩ সালে ভারতের সুরাটে প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে উপমহাদেশে তাদের উপস্থিতি শুরু হয়।
অষ্টাদশ শতকে কোম্পানিটি ক্রমে সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিতে পরিণত হয়। দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে চুক্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এর পর বাংলার শাসনভার কার্যত তাদের হাতে চলে যায়। কর আদায়, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে শাসক শক্তিতে রূপ নেয়।
ঊনবিংশ শতকের শুরুতে কোম্পানিটির নিজস্ব প্রায় আড়াই লাখ সৈন্য ছিল, যা সে সময়ের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চেয়েও বড়। তবে শোষণমূলক নীতি, একচেটিয়া বাণিজ্য এবং কৃষিতে জোরপূর্বক নীল চাষসহ নানা পদক্ষেপের কারণে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-এর পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজের অধীনে চলে যায়। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে।
প্রায় দেড়শ বছর পর ২০১০ সালে সঞ্জীব মেহতা ব্র্যান্ডটির নামের স্বত্ব কিনে লন্ডনের মেফেয়ারে বিলাসপণ্যের দোকান চালু করেন। অনেকেই একে ঐতিহাসিক প্রতীকী পরিবর্তন হিসেবে দেখেছিলেন—যে কোম্পানি একসময় ভারত শাসন করেছিল, সেটিই একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূতের মালিকানায় ফিরে আসে। ২০১৭ সালে ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেছিলেন, আধুনিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের পরিবর্তে সহমর্মিতা ও ইতিবাচক মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে।
তবে আর্থিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে না পেরে আধুনিক সংস্করণটিও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকতে ব্যর্থ হলো। এর মাধ্যমে চার শতাব্দীজুড়ে বিতর্ক, সাম্রাজ্য ও প্রতীকী পুনর্জন্মের ইতিহাস বহনকারী একটি নামের দ্বিতীয় অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল।
দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: দেড়শ বছর পর পুনর্জন্মও টিকল না
- আপলোড সময় : ২৭-০২-২০২৬ ১০:১৭:২৭ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-০২-২০২৬ ১০:১৭:২৭ অপরাহ্ন
ছবি সংগৃহীত
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট