দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে জাপান। ২০১১ সালে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর দেশটির নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এবার নিরাপত্তা যাচাই ও সরকারি অনুমোদনের পর কেন্দ্রটির একটি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) জানিয়েছে, বুধবার (২১ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেন্দ্রটির ৬ নম্বর রিঅ্যাক্টরের নিয়ন্ত্রণ রড সরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী মাস থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ ও প্রতিবাদও দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কয়েকটি নাগরিক সংগঠন ৪০ হাজারের বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পিটিশন জমা দিয়েছে। তাদের দাবি, কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রটি ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় পুনরায় চালু করা যুক্তিসংগত নয়।
জাপান দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানির বড় একটি অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কমাতে দেশটি কয়েক দশক ধরে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। তবে ২০১১ সালের ১১ মার্চ উত্তর-পূর্ব জাপানে ৯ দশমিক ০ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সৃষ্ট সুনামির পর ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এর পরপরই নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশটির সব ৫৪টি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর একযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর জাপান পারমাণবিক নিরাপত্তা নীতিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা মান পূরণ করতে সক্ষম এমন ৩৩টি চুল্লির মধ্যে পশ্চিম ও দক্ষিণ জাপানে অবস্থিত ১৪টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করা হয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর চালু হওয়া এই প্রক্রিয়ারই সর্বশেষ ধাপ।
উল্লেখ্য, ফুকুশিমা দুর্ঘটনাটি ১৯৮৬ সালের চেরনোবিলের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত। সুনামির ঢেউ কেন্দ্রটির সুরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ায় চুল্লিগুলোর শীতলীকরণ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে জ্বালানি গলে গিয়ে বিস্ফোরণ ও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এর ঝুঁকিতে আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তেজস্ক্রিয়তায় প্রাণহানি না ঘটলেও, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাস্তুচ্যুতির মানসিক চাপের কারণে বহু মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত জাপানের জ্বালানি নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিতর্কিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট