উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় রওনা হওয়া একদল অভিবাসনপ্রত্যাশীর জন্য ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ঘটনা ঘটেছে। উত্তাল ভূমধ্যসাগরে রাবারের নৌকায় টানা ছয় দিন ভেসে থাকার পর গ্রিস উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
শনিবার (২৮ মার্চ) গ্রিসের কোস্টগার্ডকে উদ্ধার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে শুক্রবার ভোরে ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী ও এক শিশুসহ ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে।
পরবর্তীতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে গ্রিসের কোস্টগার্ড জানায়, বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং ১ জন চাদের নাগরিক।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকায় থাকা মানবপাচারকারীদের একজনের নির্দেশে নিহতদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দু’জনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ক্রিট দ্বীপের হেরাক্লিয়ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নৌকাটি গত (২১ মার্চ) লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর শহর তোবরুক থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাজনৈতিক আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য গ্রিস বর্তমানে অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কোস্টগার্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রযাত্রার সময় পথ হারিয়ে ফেলার কারণে নৌকার আরোহীরা দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়াই ভেসে ছিলেন। ফলে চরম ক্লান্তি, পানিশূন্যতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে অনেকেই মারা যান। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় গ্রিস কর্তৃপক্ষ ১৯ ও ২২ বছর বয়সী দক্ষিণ সুদানের দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। নৌকাটির অবস্থান দক্ষিণ ক্রিটের ইয়েরাপেত্রা শহর থেকে প্রায় ৫৩ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে শনাক্ত করা হয়।
গ্রিসের কোস্টগার্ডের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, যাত্রাপথে নৌকাটি অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়ে। এর সঙ্গে তীব্র খাদ্য ও পানির সংকট যুক্ত হওয়ায় যাত্রীরা চরম ক্লান্তি ও অবসাদে ভুগছিলেন। এসব কারণেই ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া পাচারকারীদের নির্দেশেই মৃতদের দেহ সাগরে নিক্ষেপ করা হয়।
চলতি মাসের শুরুতে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ইউরোপে পৌঁছাতে গিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র শনিবার বলেন, “এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, অভিবাসন রুটে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কতটা জরুরি। এত মানুষের প্রাণহানির জন্য মূলত তারাই দায়ী।”
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ডুবে অন্তত ৫৫৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৮৭।
গত বছরের ডিসেম্বরে ক্রিটের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি নৌকা দুর্ঘটনায় ১৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নৌকাটি ফুটো হয়ে আংশিক ডুবে যাওয়ায় তারা প্রাণ হারান। সে সময় মাত্র দু’জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল এবং বাকি ১৫ জন নিখোঁজ থাকলেও পরে তাদের মৃত বলে ধারণা করা হ
অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নতুন একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এতে ইইউর বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পাঠানোর জন্য ‘রিটার্ন হাব’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তারা এটিকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লিবিয়া থেকে ইউরোপগামী এই নৌযাত্রা আবারও প্রমাণ করল, নিরাপদ জীবনের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি দেওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য ভূমধ্যসাগর এখনও এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ।
সূত্র: এএফপি
নিউজটি আপডেট করেছেন : স্টাফ রিপোর্টার, ডেস্ক-০২
ভূমধ্যসাগরে ৬ দিন ভেসে থাকার পর উদ্ধার ২৬ অভিবাসনপ্রত্যাশী: ২২ বাংলাদেশিসহ অন্যদের মৃত্যু ও সাগরে দেহ নিক্ষেপ
- আপলোড সময় : ২৯-০৩-২০২৬ ০৮:৩৯:১৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৩-২০২৬ ১২:০৮:০০ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট