প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তবে বিদেশে যাওয়া থেকে দেশে ফেরা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দালালের প্রতারণা, ব্যাংকিং জটিলতা এবং সরকারি সেবা গ্রহণে ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বিমানবন্দর, আর্থিক লেনদেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় অনেক প্রবাসীকে।
নতুন প্রবাসী কার্ড চালু হলে বিমানবন্দরে পৃথক ইমিগ্রেশন বুথ ব্যবহারের সুযোগ, দেশে ও বিদেশের বিমানবন্দরে বিনামূল্যে লাউঞ্জ সুবিধা, মিট অ্যান্ড গ্রিট সেবা, সরকারি হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা এবং বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে ছাড় পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিনির্ভর এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন।
সরকারের আরেকটি লক্ষ্য হলো বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করা। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে অনেক প্রবাসী অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠান। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে জনতা ব্যাংক ডুয়েল কারেন্সি হিসাব পরিচালনার সুবিধা দিচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন সেবা কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই কার্ডের মাধ্যমে আরও বেশি রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রথম ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বোয়েসেলের মাধ্যমে জর্ডানে কর্মরত প্রায় ৫০ হাজার নারীকর্মীকে এই কার্ড দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদেরও ধাপে ধাপে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। কারা কীভাবে কার্ড পাবেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রথম পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে কার্ড ইস্যু করা হবে। এজন্য জনতা ব্যাংকে হিসাব, বৈধ পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিএমইটির স্মার্ট কার্ড থাকতে হবে।
সৌদি আরবপ্রবাসী সাকিফ বলেন, দেশে যাতায়াতের সময় বিমানবন্দরে নানা ধরনের ভোগান্তির পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠাতেও বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন কার্ডের মাধ্যমে এসব দুর্ভোগ কমবে। তবে আরও কয়েকজন প্রবাসী জানান, আগে বিএমইটির স্মার্ট কার্ড থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা না পাওয়ায় নতুন উদ্যোগ নিয়েও তাঁদের মধ্যে কিছুটা সতর্কতা রয়েছে। তাঁদের মতে, ঘোষিত সুবিধাগুলো বাস্তবে নিশ্চিত হলেই এই কার্ড কার্যকর হবে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, নতুন উদ্যোগ সফল করতে শুরু থেকেই ব্যবহারকারীদের মতামত গ্রহণ, প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা জরুরি। তাঁর মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে, বিদেশে অবস্থানকালে এবং দেশে ফেরার পর পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াজুড়ে কার্ডটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর, ঋণ ও তথ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কার্ডটির বাস্তব মূল্য তৈরি হবে।
অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু কার্ড বিতরণ করলেই উদ্যোগ সফল হবে না। ঘোষিত সুবিধাগুলো বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেবার মান বজায় থাকছে কি না এবং প্রবাসীরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। তাঁদের মতে, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রবাসী কার্ড প্রবাসীদের হয়রানি কমানোর পাশাপাশি বৈধ পথে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, সরকারি সেবা সহজ করা এবং তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেস্ক রিপোর্ট