হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকা শিশুরা সাধারণত দুধ পান করার সময় দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শ্বাসকষ্টের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে খেতে পারে না। এতে প্রয়োজনীয় ক্যালোরি ও পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়। অনেক অভিভাবক শিশুর হৃদরোগ সম্পর্কে অবগত নন, আবার কেউ কেউ জানলেও কী ধরনের খাদ্য প্রয়োজন তা বুঝতে পারেন না। এর ফলে শিশুর ওজন বাড়ে না, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বারবার নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু যদি মায়ের দুধ পান করে, তাহলে প্রথমেই মায়ের পুষ্টির দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে বুকের দুধের গুণগত মান উন্নত হয়। হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকা শিশুর জন্য বুকের দুধ সবচেয়ে উপযোগী, কারণ এটি সহজে হজম হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। শিশু যদি সরাসরি দুধ পান করতে না পারে, তাহলে এক্সপ্রেসড ব্রেস্ট মিল্ক কাপ বা চামচের মাধ্যমে খাওয়ানো যেতে পারে।
ছয় মাস বয়সের পর শিশুর খাদ্যতালিকায় ক্যালোরি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করা প্রয়োজন। ডিম, মুরগির মাংস, ছোট মাছ, সয়াবিন, মসুর ও মাশকলাইয়ের ডাল, চিনাবাদাম এবং দই সহজলভ্য ও কার্যকর প্রোটিনের উৎস। ভাতের সঙ্গে সরিষার তেল বা ঘি মিশিয়ে দিলে ক্যালোরির পরিমাণ বাড়ে। পাশাপাশি কলা, মিষ্টিআলু, কাঁঠাল ও পাকা পেঁপে শক্তির ভালো উৎস হিসেবে কাজ করে। পালংশাক, লালশাক ও পুঁইশাকে থাকা আয়রন ও ভিটামিন রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়ক।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, এসব শিশুকে একবারে বেশি খাবার না দিয়ে দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার অল্প অল্প করে খাওয়ানো উচিত। খাবার নরম ও কিছুটা ঘন হলে শিশুর জন্য গিলতে সহজ হয় এবং কম শক্তি ব্যয় হয়। অতিরিক্ত তরল খাবার পেট ভরালেও প্রয়োজনীয় ক্যালোরি নিশ্চিত করতে পারে না।
হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র থাকা শিশুদের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত লবণ ও চিনি পরিহার করা জরুরি। বেশি লবণ শরীরে পানি জমিয়ে হৃদপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও চর্বিযুক্ত খাবারও সীমিত রাখতে হবে।
ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ ইলিশ, রুই, কাতলা ও বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এছাড়া চিনাবাদামও এই উপাদানের একটি ভালো উৎস। আয়রনের ঘাটতি পূরণে কলিজা, ডিমের কুসুম, সবুজ শাকসবজি ও ডাল নিয়মিত খাওয়ানো প্রয়োজন। লেবু, আমলকী বা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে এসব খাদ্য গ্রহণ করলে আয়রন শোষণ আরও ভালো হয়।
হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এতে অনেক সময় পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি পুষ্টি কর্মসূচি, শিশু হাসপাতালের পুষ্টি বিভাগ এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচারের আগে শিশুর পুষ্টিগত অবস্থা যত ভালো থাকবে, সফল অস্ত্রোপচার ও দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।
ডেস্ক রিপোর্ট