মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সম্ভাব্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ায় ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে রিজার্ভ ধরে রাখা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
শনিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর বোর্ডরুমে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান–এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের আটজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এসব মতামত তুলে ধরেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদেরা নীতি সুদহার এখনই কমানো থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেন। তাঁদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদহার কমানো হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ বাড়াতে ভবিষ্যতে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বৈঠকের একাধিক সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করে আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের কথাও উঠে আসে। প্রয়োজনে ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুর–এর মতো দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
অর্থনীতিবিদেরা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা এখনই পুরোপুরি ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বৈঠকে প্রবাসী আয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারে সমস্যা দেখা দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। তবে যারা দেশে অর্থ পাঠাতে চান, তাঁদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ ও নির্বিঘ্ন করার ওপর জোর দেন অর্থনীতিবিদেরা।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুত ঋণ দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তেলের আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত অর্থনীতিবিদেরা বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তাই এমন কোনো নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না, যাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও মত দেন তাঁরা।
বৈঠকের সূত্র জানায়, গভর্নর মোস্তাকুর রহমান অর্থনীতিবিদদের জানান যে তিনি সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চান এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন মোস্তাকুর রহমান। তবে নীতিনির্ধারণী কমিটির এক সদস্যের পদত্যাগ ও কয়েকজন অর্থনীতিবিদের আপত্তির কারণে সেই বৈঠক স্থগিত হয়ে যায়।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ বিষয়ে মতামত নিতে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সভায় গভর্নরের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের চার ডেপুটি গভর্নর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ছিলেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান, ড. ফাহমিদা খাতুন, ড. মোস্তফা কে মুজেরী, ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, ড. সেলিম রায়হান, মাসরুর রিয়াজ, ড. এ কে এনামুল হক এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।
ডেস্ক রিপোর্ট