ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। হামলার পেছনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কী—তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস, কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন—বিভিন্ন সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের কথা বলা হলেও এসবের পক্ষে সুস্পষ্ট যুক্তি বা প্রমাণ সামনে আসেনি।
অনেকেই ধারণা করছেন, হামলার অন্যতম কারণ ছিল ইরানের কথিত পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি। তবে এ ধরনের কর্মসূচির নিশ্চিত প্রমাণ কখনোই প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প আগেই দাবি করেছিলেন, পূর্বের এক হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে বর্তমান অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, তেহরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, যে পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল, তা ভেঙে যায় ঠিক তখনই যখন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সরাসরি উসকানি ছাড়াই হামলা চালায়। আবার হামলার ঠিক আগে মধ্যস্থতাকারী ওমান জানিয়েছিল, ওয়াশিংটনের বেশিরভাগ শর্তই তেহরান নীতিগতভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল এবং একটি সম্ভাব্য সমঝোতা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যদি ইরান উত্তর কোরিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
হামলার আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করার কথাও বলা হচ্ছে। তবে ইরানের জন্য এই কর্মসূচি দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি পরিত্যাগ করলে দেশটি সম্ভাব্য সামরিক হামলার মুখে আরও অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে।
সংঘাতের শুরুতে তেহরানে বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার শুরুতেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। যদিও এসব ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এই সামরিক অভিযান তার বহুদিনের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের সুযোগ তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নীতি ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবেই বহু বছর ধরে বজায় রয়েছে।
বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৩ সালের Iraq War-এরও তুলনা করছেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে এমন কোনো অস্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমান সংঘাতের পেছনের যুক্তি নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের উদ্যোগ প্রায়ই অপ্রত্যাশিত ও জটিল পরিণতি ডেকে আনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি বড় এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্র। তাই এই সংঘাতের ফলাফল কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।
ইরানে হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য? যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন
- আপলোড সময় : ০৭-০৩-২০২৬ ১০:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৭-০৩-২০২৬ ০১:৫৬:১৮ অপরাহ্ন
ছবি সংগৃহীত
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট